মুদি দোকান, প্রসাধন সামগ্রীর দোকানসহ বিভিন্ন খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভ্যাটের সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং করের আওতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন কয়েকটি ব্যবসা খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় থাকা খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে মুদি দোকান, তৈরি পোশাক ও কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, প্রসাধন সামগ্রীর দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্যের বিক্রেতা, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার, সেনিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্ট ব্যবসা, ফার্নিচার, মিষ্টান্ন ভা-ার এবং রেস্তোরাঁ।
দেশে ব্যাংক হিসাব ১৯ কোটি ৩২ লাখ : সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি, যা মোট হিসাবের বড় অংশ।
তিনি আরও জানান, দেশের ব্যাংকগুলোয় বর্তমানে মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করতে সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সব নাগরিককে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যে জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল-২ প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।
মোবাইল অপারেটরদের কাছে সরকারের বকেয়া ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা : সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দেশের চারটি মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে গ্রামীণফোনের কাছে, যার পরিমাণ ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের কাছে বকেয়া রয়েছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া রবি আজিয়াটা লিমিটেডের কাছে ৬১৫ কোটি এবং বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেডের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। সরকার বকেয়া রাজস্ব আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে বলে সংসদকে জানান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী।
পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি হয়নি : সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। তবে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত ১০টি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, এসব দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং-চায়না ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া ঋণের অর্থ উদ্ধারে ৩০ ব্যাংকের উদ্যোগ : ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচারের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক ঋণের অর্থ পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে এটি একটি দেওয়ানি (সিভিল) প্রক্রিয়া। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো ৯টি আন্তর্জাতিক আইনগত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে ছয়টি মামলাকে কেন্দ্র করে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এগুলো হলো সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা এবং ওরিয়ন গ্রুপ-সংক্রান্ত মামলা।
রেজল্যুশনের আওতায় নেওয়া পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীরা কবে, কতটুকু ও কোন শর্তে টাকা ফেরত পাবেন, তা নিয়ে সংসদের প্রশ্নোত্তরে একাধিক সংসদ সদস্য জানতে চেয়েছেন। অন্তত ছয়জন সংসদ সদস্য ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, আমানতকারীর টাকা ফেরত, কথিত ‘হেয়ার কাট’, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়া ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি বা এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসিকে ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম, ২০২৫-এর আওতায় নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংকের দায় ও সম্পদ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে হস্তান্তর করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
অপর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে এরই মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে আমানতকারীরা বর্তমানে তাদের সুরক্ষিত আমানত তুলতে পারছেন।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সাড়ে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ : পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দীকার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বর্তমানে সেতু বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধীনে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।