বিশ্বকাপ জ্বর ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

সারা দেশ এখন ফুটবল বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে। সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোও এই জ্বরে আক্রান্ত। পছন্দের দলের পক্ষে তুলে ধরা যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে ব্যস্ত সবাই। মাঠের লড়াইয়ের থেকে কোনো অংশে কম উত্তেজনাকর নয় মাঠের বাইরের এই লড়াই। সেই উত্তাপে আক্রান্ত হয়েছে উদয়কাঠীর ইমেইল বক্সও। শিক্ষার্থীরা নিজ দলের পক্ষে যেমন স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়েছেন, তেমনি অতি উৎসাহী কর্মকান্ড থেকে যেন অনাকাঙ্খিত কোনো ঘটনাও না ঘটে, সে আহ্বানও জানিয়েছেন তারা

বাবাকে দেখেই ব্রাজিল দল সমর্থন করা

যখন আমি ফুটবল খেলাটিও ঠিকঠাক বুঝতাম না, তখন থেকেই আমি ব্রাজিল টিমের সমর্থক। কারণ বাবা ব্রাজিল সমর্থন করতেন। বাবার সঙ্গে খেলা দেখা এবং হলুদ জার্সি পরে দলকে চিয়ার করার মধ্য দিয়েই আমি ফুটবল খেলাকে ভালোবাসতে শিখেছি। কেন ব্রাজিল দলকে সমর্থন করি তার জুতসই জবাব দেওয়ার জন্যই আমাকে জানতে হয়েছে এই দলের খেলোয়াড়দের নাম, নৈপুণ্য ও বিগত সময়ের পরিসংখ্যান। ভীষণভাবে উপভোগ করতাম বন্ধুদের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ভার্সাস ব্রাজিল তর্কগুলো। সত্যি বলতে কী, এগুলোও আমার কাছে ফুটবলের অংশ বলে মনে হতো।

বিশ্বকাপ চলছে, ফেসবুকে বন্ধুদের তর্ক-বিতর্ক দেখছি আর আফসোস বাড়ছে, কেন আমিও নেই সেই মাঠে? তবে সামনাসামনি তর্ক-বিতর্ক করতে না পারার আক্ষেপ মিটিয়ে নিচ্ছি অনলাইনে। তবু এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে বিশ্বকাপ ঠিকমতো উপভোগ করতে পারছি না বলেই মনে হচ্ছে।

আরেকটি বিষয় এবারের বিশ্বকাপকে বিশেষ করেছে আমার কাছে। তা হলো, এবার আমি ব্রাজিল দলের সঙ্গে সমর্থন করছি কানাডাকেও। যে দেশে আছি সে দেশকে সমর্থন না করে কি পারা যায়। এটা শুধু তাদের খেলা দেখে সমর্থন জানাচ্ছি তা নয়। এ দেশটি একজন বিদেশি শিক্ষার্থীকে যে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছে, নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে, সেই কৃতজ্ঞতারও একটি প্রকাশ। ব্রাজিল ও কানাডার সর্বোচ্চ ভালো করুক এবারের বিশ্বকাপে এটাই আমার চাওয়া।


মৌমিতা সরকার

দ্বিতীয় বর্ষ, কগনিটিভ সায়েন্স, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি

বিশ্বকাপে মেসিকে দেখাই প্রাপ্তি

আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন ২০১৪ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেই বিশ্বকাপে মেসি এবং আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আমাকে ভীষণভাবে বিমোহিত করেছিল। যদিও ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনায় মেসির নৈপুণ্য দেখার কারণে তার প্রতি আমার আবেগ ও ভালোবাসা ২০১৪ বিশ্বকাপের আগেই তৈরি হয়েছিল।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়ের পর মেসির বিমর্ষ মুখে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’-এর পুরস্কার হাতে নিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটি আমার মনে গভীর দাগ কেটে যায়। এরপর সবসময় প্রত্যাশা ছিল যেন মেসির হাতে ট্রফি দেখতে পাই।

কিন্তু ২০১৫ ও ২০১৬ সালে লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মিশনে পরপর দুবার ফাইনালে উঠেও চিলির কাছে পরাজয় সব আশা আকাক্সক্ষাকে মাটিচাপা দিয়েছিল। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, মেসি হয়তো দেশের হয়ে বহুল আকাক্সিক্ষত সেই ট্রফিটা আর কখনোই জিততে পারবেন না। এরপর যখন তিনি জাতীয় দলের হয়ে আর না খেলার ঘোষণা দিলেন, তখন আর্জেন্টিনার একজন ডাইহার্ড ফ্যান হিসেবে খবরটা আমার কাছে মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো ছিল।

কিন্তু বিধাতার পরিকল্পনা হয়তো ভিন্ন ছিল। এরপর লিওনেল স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা যেন এক নতুন যুগে পদার্পণ করল। একে একে ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়, ফিনালিসিমা ট্রফি জয় এসব যেন আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে স্বপ্নপূরণের মতো ছিল। তারপর ২০২২ বিশ্বকাপে মেসি এবং তার আর্জেন্টিনা যা করে দেখাল, তা এক কথায় রূপকথাকেও হার মানায়।

সমালোচকরা যখন একটি বিশ্বকাপের মাপকাঠিতে মেসির শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছিল, তখন ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে মেসি তাদের সব সমালোচনার জবাব দিয়ে দেন এবং সমালোচকদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন।

একজন মেসি সমর্থক হিসেবে আমি আমার চাওয়ার শতভাগ পেয়েছি। ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি আর আর্জেন্টিনার কাছে আমার তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। মেসিকে মাঠে দেখতে পারাটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখন যতদিন সম্ভব, ততদিন প্রাণভরে মেসিকে উপভোগ করতে চাই।


জুটন সরকার

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় সেমিস্টার, তৃতীয় বর্ষ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আনন্দ ও বিষাদের বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ ফুটবল বরাবরের মতোই রঙিন। একে অন্যকে খোঁচা মেরে কথা বলাতেই যেন সমুদ্র সমান আনন্দ পাওয়া যায়! এতেই মেতে থাকে স্কুল- কলেজ-ভার্সিটিসহ সব জায়গা। একজন আর্জেন্টাইন সাপোর্টার হিসেবে একাধিকবার তীরে এসে তরি ডোবার পর যখন ২০২২ সালে এসে সেই সোনালি ট্রফি মেসির হাতে ধরা দিল, তারপর থেকে কোনো উচ্ছ্বাসই আর বেশি মনে হয়নি, ফুটবলে চাওয়ারও কিছু নেই। একজন আর্জেন্টাইন সাপোর্টার হিসেবে এই বিশ্বকাপ আমার কাছে যেমন সুখের, তেমনি দুঃখেরও প্রতিচ্ছবি। এই বিশ্বকাপই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ, তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় মেসি অবসর নেবেন, যা বিশ্বকাপের উন্মাদনার আড়ালে এক করুণ অনুভূতির সৃষ্টি করছে।

ফুটবলে যেকোনো কিছুই হতে পারে, তবে চাই ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন আর্জেন্টাইন শিবিরের হাতেই থাকে। আবারও সেই উদযাপন হোক মেসির হাতেই। আবারও মেসি মেসি ধ্বনিতে মুখরিত হোক স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে ফুটবলপ্রেমী সবাই।


হুমায়ুন আহমেদ নাইম

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় সেমিস্টার, দ্বিতীয় বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

গ্রান্দে ব্রাজিল, গ্রান্দে স্বপ্ন

শৈল্পিক, নান্দনিক ফুটবলের আঁতুড়ঘর ব্রাজিল। আর আমি সেই ব্রাজিল ফুটবল টিমের এবং নেইমারের অনেক বড় ভক্ত। নেইমারকে দেখে ফুটবল বুঝতে শিখেছি, নেইমারকে দেখে ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখেছি। ২০১১ সালে প্রথম নেইমারের খেলা দেখার পর ২০১৩ সালে যখন স্পেনকে হারিয়ে ব্রাজিল কনফেডারেশন কাপ জিতল (সেই ম্যাচে নেইমার একটি গোলও করেছিল এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিল) ঠিক তখন থেকেই একটা স্বপ্ন দেখতাম আর সেটা হলো নেইমারের হাতে সোনালি ট্রফিটা দেখা। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ সালের বিশ্বকাপগুলো হতাশায় কাটলেও এবার আবারও স্বপ্ন দেখছি ব্রাজিল হেক্সা মিশন সম্পন্ন করবে এবং সে সঙ্গে আমাদের পোস্টারবয় নেইমারের হাতে সোনালি ট্রফি উঠবে, সেই সোনালি ট্রফিটাও হয়তো সেদিন মনে মনে বলবে, আজ আমি সার্থক! এবার আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তথা আমার নিজ ক্যাম্পাসে বন্ধুবান্ধব, বড় ভাই, ছোট ভাইদের সঙ্গে বড় পর্দায় খেলা দেখব। অন্যরকম একটা ভালোলাগা, উন্মাদনা কাজ করছে। এই উন্মাদনা সারা বিশ্বজুড়েই। আশা রাখছি এই উন্মাদনার মধ্য দিয়েই ব্রাজিল এবার মিশন হেক্সা সম্পন্ন করবে। গ্রান্দে ব্রাজিল!


প্রিয়ন্ত সরকার

শিক্ষার্থী, প্রথম সেমিস্টার, দ্বিতীয় বর্ষ, সংগীত বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

স্বপ্ন ছোঁয়ার শেষ সুযোগ

ফুটবল বিশ্বকাপ বাংলাদেশে না হলেও বাংলাদেশের প্রতিটি বাসা থেকে শুরু করে প্রতিটি কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই যেন সেই ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়। যে যার পছন্দের খেলোয়াড় নিয়ে অন্যদের হারানোর সর্বোচ্চ যুক্তি দিয়ে থাকে। সারা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ভক্ত, ঠিক তখন আমি সবকিছুর বিপরীতে রোনালদো ভক্ত, সঙ্গে পর্তুগাল। রোনালদো বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের একজন উজ্জ্বল তারকা, কী নেই তার ঝুলিতে! ক্লাব ফুটবলে তিনি প্রায় সব বড় শিরোপাই জিতেছেন, অর্জন করেছেন ব্যক্তিগত অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। শুধু নেই, যেটা সবাই অর্জন করতে চায় সেই ট্রফি। রোনালদো বহুবার বলেছেন, পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি। কেন জানি সেটা অপূর্ণ রয়েই গেছে এখনো। প্রতিটি ফুটবল ভক্তেরই স্বপ্ন থাকে নিজের প্রিয় খেলোয়াড় যেন সেই সোনালি ট্রফি ছুঁতে পারে। রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ, তাই এবারই শেষ সময় তার কাছে, নতুন ইতিহাস গড়ার। নতুন করে ইতিহাসে তাকে জায়গা করে নেওয়ার। স্বপ্ন একটাই, লক্ষ্যও একটাই ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬। এই মিশনে আমার মতো তার ফ্যানেরা তার পাশে থেকে তাকে উৎসাহ জোগাবে, আশা বেঁধে রাখি তার হাতে উঠবে এবারের সেই বিশ্ব ফিফা বিশ্বকাপ ।


মুনতাসির মামুন

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় সেমিস্টার, দ্বিতীয় বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

এক ট্রফির খোঁজে কোটি হৃদয়ের স্পন্দন

২০১০ সালের জুন মাসের কথা। চারপাশে বৃষ্টির মৌসুম। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। বিশাল পতাকা টাঙানো হলো বাড়ির সামনে। শুরু হলো বিশ্বকাপের উত্তেজনা। গ্রামের আনাচে কানাচে শুনতে পেলাম কাকা, থিয়াগো সিলভা, মার্সেলোদের মতো প্লেয়ারের নাম। হলুদ সবুজ জার্সি হয়ে উঠল আমার ভালোবাসা। তারপর কত দিন গেল আর গোনা হয়নি। ভার্সিটিতে এলাম, কখনো রুয়েটের টঙে আবার কখনো বা রাবির বাসে বসে প্রিয় দলকে নিয়ে কত বিতর্ক করেছি। ২০২৬-এর বিশ্বকাপ সামনে। এটাই হবে আমাদের জেনারেশনের প্রিয় খেলোয়াড়দের শেষ নৃত্য। আর তারপর আমরা হয়তো মেসি, ক্রিস্টিয়ানো ও নেইমারকে মাঠের বাইরে দেখব। তবে সে কথা যাক, সেলেসাওরা কি তাদের সেই চিরচেনা ছন্দ ও নান্দনিকতা ফিরে পাবে, নাকি ইতালিয়ান ম্যানেজারই হবে তাদের শেষ ভরসা। শেষ বিদায়ের বেলায় নেইমার তার জাদু কি দেখাতে পারবে? এই প্রশ্নগুলো এখন প্রচ-ভাবে নিজেকে ধরে আছে। তবু স্বপ্ন দেখি, দেখি ট্রফি হাতে শেষ বিদায় নিতে নেইমারকে।


তাওহীদ হোসেন

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত