৬ গোলের থ্রিলারে জিতল ফুটবল হারল ইরান

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

রহস্য-রোমাঞ্চের রাজা আলফ্রেড হিচকক যদি বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের চিত্রনাট্য লিখতেন, তবে কানসাস সিটির এই রাতের চেয়ে নিখুঁত কিছু হয়তো তিনিও বানাতে পারতেন না! ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার মাত্র ১২০ সেকেন্ড আগেও মেক্সিকোর বেস ক্যাম্পে বসে উৎসবে মেতে উঠেছিল ইরান। আলজেরিয়া ৩-২ ব্যবধানে জিতলেই এশীয় পরাশক্তিদের নিশ্চিত নকআউট। কিন্তু যোগ করা সময়ের শেষ কিকের জাদুতে আলজেরিয়ার জালে অস্ট্রিয়া বল জড়াতেই থমকে গেল মেক্সিকো সীমান্ত, উল্লাসে ফেটে পড়ল কানসাস সিটি। ৩-৩ গোলের এই অবিশ্বাস্য, অলৌকিক ড্রয়ের পর অস্ট্রিয়া কোচ রালফ রাংনিক মাথা নেড়ে তাই বলতে বাধ্য হলেন, ‘হিচকক যদি এমন নাটক লিখতেন, আমি বলতাম তিনি পুরোপুরি পাগল।’ এদিকে আলজেরিয়ান কোচ ভøাদিমির পেটকোভিচের কাছে জেতেনি কোনো দল, তবে জিতেছে ফুটবল। সঙ্গে হেরেছে ইরানের স্বপ্ন।

অথচ এই ম্যাচের আগে ফুটবলপ্রেমীদের মনে ভিন্ন এক ভীতি দানা বেঁধেছিল। বিশ্বকাপের ৪৮ দলের এই নতুন ও অসম ফরম্যাটের কারণে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া উভয় দলই মাঠে নামার আগে জানত, কেবল একটি ড্র করলেই দুপক্ষেরই শেষ ৩২ নিশ্চিত। এতে ফুটবল দুনিয়া আশঙ্কা করছিল ১৯৮২ সালের স্পেনের গিজনের সেই কুখ্যাত পাতানো ম্যাচের, যেখানে এই অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানি মিলে বল দেওয়া-নেওয়া করে আলজেরিয়াকে বিদায় করেছিল। কিন্তু কানসাস সিটির ৬৯ হাজার দর্শকের সামনে কোনো ‘লজ্জার স্ক্রিপ্ট’ মঞ্চস্থ হয়নি, বরং হয়েছে এক অলৌকিক ফুটবল প্রদর্শনী। অস্ট্রিয়া কোচ রাংনিক এই থ্রিলিং অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে কোচিং করাচ্ছি। এত নাটকীয় এবং অপ্রত্যাশিত ম্যাচ আমার মনে পড়ে না।’

মাঠের লড়াইয়ে প্রথমার্ধের ২৮ মিনিটে ডেভিড আলাবার পাস থেকে ৩৭ বছর বয়সী মার্কো আর্নাউতোভিচের গোলে প্রথমে লিড নেয় অস্ট্রিয়া। বিরতির ঠিক আগে রাফিক বেলঘালির চোখ ধাঁধানো গোলে সমতায় ফেরে আলজেরিয়া। দ্বিতীয়ার্ধে মার্সেল সাবিতজার অস্ট্রিয়াকে আবারও এগিয়ে দিলে ইরানের আশা উজ্জ্বল হয়, কিন্তু পাঁচ মিনিট পরেই রিয়াদ মাহরেজের দুর্দান্ত গোল আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরায়।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার মুখে যখন গ্যালারিতে দর্শকরা বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন, ঠিক তখনই ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ শুরু। ৯৪ মিনিটে মাহরেজ নিজের দ্বিতীয় গোল করে আলজেরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়ে গেলে অস্ট্রিয়ার বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠেছিল। ঠিক তখনই রাংনিকের শেষ চাল হিসেবে মাঠে নামেন কালাইজদজিচ। মাঠে পা রেখে প্রথম টাচেই, ৯৬ মিনিটে এক বুলেট গতির হেডে তিনি বল জালে জড়ান। অস্ট্রিয়ান মিডফিল্ডার সাবিতজার এই গোল নিয়ে বলেন, ‘৯৪ মিনিটে গোল খেয়ে যখন ভাবছেন সব শেষ, তখনো আমরা বিশ্বাস রেখেছিলাম। সতীর্থদের উদ্দেশে লং বল বাড়ালাম, আর হেড-হেড থেকে ৩-৩! অবিশ্বাস্য!’

এই এক গোলেই ৪৪ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠার ইতিহাস গড়ে অস্ট্রিয়া। আর ইরানকে বিদায় করে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেয় আলজেরিয়া। আলজেরিয়ান কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচ বলেন, “আমি অত্যন্ত খুশি যে শেষ পর্যন্ত ফুটবল জিতেছে।” অধিনায়ক মাহরেজও পরের রাউন্ডে যাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করেন। তবে এই আনন্দের অন্তরালে ট্র্যাজেডির মহানায়ক হয়ে রইল ইরান। মেক্সিকো সীমান্ত থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এক আবেগঘন বিবৃতিতে ইরান দল জানায়, “তিজুয়ানা ছেড়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত কষ্টের।” ফুটবল এই অনন্য রাত কানসাস সিটিকে এক কালজয়ী থ্রিলার উপহার দিলেও, ইরানের জন্য তা রেখে গেল এক বুক দীর্ঘশ্বাস। নকআউটে এখন অস্ট্রিয়া লড়বে স্পেনের বিরুদ্ধে এবং আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত