শিল্প রেখে অনন্তলোকে শিল্পী

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:০৩ এএম

‘পারুল’, ‘বাঘা’, ‘মেনি’, ‘মিনা’ শিশুদের শিক্ষা ও চিত্তবিনোদনের জন্য সৃষ্ট একেকটি তুমুল জনপ্রিয় চরিত্র। পাপেট ও কার্টুন সিরিজের চরিত্রদের রেখে অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন এগুলোর স্রষ্টা মুস্তাফা মনোয়ার। এ দেশের সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম পুরোধা এ ব্যক্তিত্ব গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন যাবৎ নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। স্ত্রী মেরী মনোয়ার, পুত্র সাদাত মনোয়ার ও কন্যা নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী, স্বজন রেখে গেছেন দেশবরেণ্য এই চিত্রশিল্পী।

মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা, চারুকলা ইনস্টিটিউটে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। তার আগে প্রথম জানাজা সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল রামপুরার বাংলাদেশ টেলিভিশনে।

গতকাল মৃত্যুর পর তার মরদেহ নেওয়া হয় ধানম-ি ১ নম্বর সড়কের বাসভবনে। পরিবার ও স্বজনদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ রাখা হয়েছে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে।

বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে শিল্প-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া বইছে।  গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘ মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। জাতি তার অবদানকে সর্বদা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’

পৃথক শোকবার্তায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। বিশেষ করে চিত্রকলা এবং শিশুতোষ সৃজনশীল অনুষ্ঠান নির্মাণে তার অনন্য ও কিংবদন্তিতুল্য অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’

শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রমুখ। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শোক প্রকাশ করেছে।

পারুল কাকে ডাকবে ‘শিল্পী ভাইয়া’ : ছোটবেলাতেই মুস্তাফা মনোয়ারকে আকৃষ্ট করেছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ। যে কারণে কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি পাপেট নিয়ে কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশে নতুন শিল্প আঙ্গিক পাপেটের বিকাশ তার হাত ধরেই।

প্রতিটি সৃজনকর্মে বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে গেঁথে দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন এই বিশুদ্ধ ধারার শিল্পী। যে কারণে তার পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠে ‘পারুল’। এই সেই ‘পারুল’ যে নামটি শুনলেই মনে পড়ে চিরস্মরণীয় লোকগাথার ‘সাত ভাই চম্পা’র কথা। সেই-ই পারুল বোন, যে একদিন জাগিয়েছিল সাত ভাইকে। পারুলের কাছে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন ‘শিল্পী ভাইয়া’। পারুল এখন কাকে ডাকবে ‘শিল্পী ভাইয়া’?

আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ‘মীনা’কার্টুনের ‘মিনা’ চরিত্র সৃষ্টির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মানসম্পন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ তারই সৃষ্টি। তার নির্মিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানও মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর নতুন আঙ্গিকে শিল্পজগতে মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ। টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানের পাপেট শো’র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রও তার অনন্য সৃষ্টি।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লালরঙের সূর্যের প্রতিরূপ বৃত্তটি তার চিন্তাপ্রসূত। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারির আগে এটি প্রতিস্থাপন করা হয়। যা বসন্তের বর্ণিল আবহে রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের অমলিন ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।

তিনি টেলিভিশন নাটকে অতুলনীয় কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। শিল্পকলার নন্দনতত্ত্বের উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবেও নিজেকে মেলে ধরেন।

১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা না তুলে তিনি গাওয়ালেন রবীন্দ্রনাথের গান ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি ...’। পূজাপর্বের গান মুহূর্তে রূপান্তরিত হয়ে যায় দেশে প্রেমের গানে। মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে টেলিভিশনে প্রচারিত তার আরেকটি অনুষ্ঠান স্মরণীয় হয়ে আছে। ফজল-এ- খোদা রচিত ও আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন মুস্তফা মনোয়ার। গানটি গেয়েছিলেন দশজন শিল্পী, কিন্তু যখন প্রচারিত হয় তখন দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন কয়েকশ শিল্পী একত্রে গাইছেন। এটি সম্ভব হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের অসাধারণ নির্দেশনার কারণে। শহীদজননী জাহানারা ইমাম তার বিখ্যাত ‘একাত্তরের দিনগুলো’তে এই অনুষ্ঠানের উল্লেখ করেছেন বিশেষভাবে।

বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম : মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুরের নাকোল গ্রামের মাতুলালয়ে। তার ডাক নাম ছিল মন্টু। বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পৈত্রিক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর সংগীতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। ছবি আঁকার ‘অপরাধে’ কারাবরণও করতে হয় তাকে।

ছাত্রাবস্থায়ই শিল্পকর্মে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি অফ ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরঙ শাখার শ্রেষ্ঠ কর্মের জন্য দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথমস্থান অর্জন করেন। পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর একে একে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিল্প-সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন।

শিল্পকলায় অনবদ্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তাকে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ২০১৯ সালে লাভ করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্র্তৃক প্রদত্ত ‘সুলতান স্বর্ণপদক-২০১৮’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত