একজন মানুষের এত রূপ থাকে কি করে? মাঝে মাঝে আমি খুব বিস্মিত হই! মানুষের এক মুখের গভীরেই লুকিয়ে থাকে অনেক মুখ। অনেক চেহারা! অনেক রূপও হয়তো থাকে। কিন্তু এত গুণাগুণ থাকে কি করে? যারা শিল্প-সাহিত্যের বাসিন্দা, তাদেরও তো গুণের সীমাবদ্ধ থাকার কথা! এ ব্যাপারটা চিন্তা করলে, আমি বিস্মিত হই! মাঝে মাঝে তো বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। এমন একজন মানুষকে আমি চিনি, যার নানান রূপ দেখে, নানানভাবে আমি চমকে গেছি। হয়েছি চমৎকৃতও।
বলতে গেলে, বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার শৈশব পার হয়েছে। ছেলেবেলার দিনগুলো কেটে গেছে এক রোমাঞ্চকর উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে।
টেলিভিশনের আলিশান মহড়া কক্ষে নাচের রিহার্সেল হচ্ছে। কোনায় দাঁড়িয়ে আমি দেখছি, সেই ভদ্রলোক শিল্পীদের সবকিছুই দেখিয়ে দিচ্ছেন। নাচ কীভাবে হবে। নাচের মুদ্রা কীভাবে হবে। নাচটা টেলিভিশন ক্যামেরায় যখন ধরা হবে, তিন ক্যামেরায় কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ধরা হবে। সবকিছু নিয়ে অনর্গল পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তার পরামর্শ মতোই হুবহু চলছে সবকিছু। টেলিভিশন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাটক নির্মাণ হচ্ছে মুখরা রমণী বশীকরণ। দিন পেরিয়ে রাতভর রেকর্ডিং হচ্ছে। যার কথা বলছি, তিনি প্রযোজক। তিনিই ডিজাইনার। তিনিই দৃশ্য পরিকল্পক। তাকেই চিন্তা করতে হচ্ছে রাজার পরনের পোশাক কী হবে! কেমন হবে রাজার মুকুটটি। নিজের সুবিশাল ঘর ছেড়ে চলে এলেন মহড়া কক্ষে। মেকআপ রুমের এক কোনায় বসে, কাগজ-কলম নিয়ে, কাঁচি দিয়ে তিনিই ঠিক করছেন কী করবেন। মুকুট তৈরি করছেন এবং এই রাজার মুকুট তৈরি করতে করতে কখন যে রাত ভোর হয়ে গেছে, সেটিও টের পাননি তিনি! রাজার মুকুটটা যখন তৈরি হলো, আশপাশের সবাইকে ডেকে বললেন দ্যাখো তো, এই রাজার মুকুট হয়েছে কিনা! সবাই বাহবা দিল। ততক্ষণে ঘুমে সবার চোখের পাতা জড়িয়ে আসছে। তিনি সবাইকে বললেন কিছুক্ষণ চোখ বুজে বিশ্রাম নাও। রাতে আবার অন্য কাজ শুরু হবে।
ছোটদের অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়ি। সে এক এলাহি আয়োজন। কতকিছু কতভাবেই যে হতে পারে। অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে ছোটদের পাপেট তৈরি করছেন। এখন তো ডিজিটাল যুগে অনেক রকম, অনেকভাবে পাপেট হচ্ছে। কতকিছু, কতভাবে যে হতে পারে, সেটি তিনি ভেবেছেন সেই সময়ে। ভাবনাকে নিজের মতো করে কাজেও লাগিয়েছেন। সেই ম্যানুয়েল যুগে, যখন কোনো কিছুই এখনকার মতো ছিল না। সেই যুগে পুরোপুরি একক চেষ্টায় একক মেধা খাটিয়ে তিনি তৈরি করেছেন চোখধাঁধানো চমকপ্রদ পাপেট। সেই পাপেট তিনি তৈরি করেছেন এমনভাবে, যেখানে মুখের অভিব্যক্তিও পাওয়া গেছে।
শুধু খুদে দর্শকরাই নয়, বড়রাও হয়েছেন বিস্মিত। আমাকে আরও অবাক করে, চমৎকৃত করে তার কথা বলার ভঙ্গি। টিভি ক্যামেরার সামনে কিংবা সামনাসামনি, যে উদাহরণ তিনি দেন, যেসব কথা বলেন, তা সবাইকেই মুগ্ধ করে। প্রায়ই দেখা গেছে, তিনি গান গাইছেন হারমোনিয়াম নিয়ে। কী দরদভরা গলা। কঠিন সব গান গাইছেন। এসব কিছু নিয়েই এ মানুষটা। একজন মানুষ কী করে একসঙ্গে এতসব করেন, আমার জানা নেই। আমি বুঝতেও পারি না। মুখ ফুটে কোনো দিন বলাও হয়ে ওঠে না। সামনাসামনি উচ্ছ্বসিতও হয়ে উঠতে পারিনি। তবে বরাবরই মনে মনে শ্রদ্ধা করে আসছি। বলতে পারিনি, ‘স্যার আপনার প্রতি আমার এই যে মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা কোনো দিন আপনাকে জানাতে পারিনি।’ জানানোর সুযোগও দেননি তিনি। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার একটা লম্বা সময় তার সঙ্গে কাটাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পুরোধা ব্যক্তিরা সবাই তাকে চেনেন। তার প্রতিভায় বিমুগ্ধ কমবেশি সবাই। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন বন্ধু। মামা বলে ডাকি। তিনি আমাদের মন্টু মামা। সবার প্রিয় মুস্তাফা মনোয়ার। অনেক গুণ তার। অনেক জ্ঞান তার।
এই মুহূর্তে, তাকে নিয়ে কত কথা যে মনে পড়ছে
ছোটবেলার ‘নতুন কুড়ি’ অনুষ্ঠান। এই নামটি একটি কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। তার বাবা কবি গোলাম মোস্তফার লেখা। কবি গোলাম মোস্তফার কবিতার শিরোনাম ছিল ‘আমরা নতুন আমরা কুঁড়ি।’ সেখান থেকেই ‘নতুন কুঁড়ি’ নাম দিয়ে অনুষ্ঠানটি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেদিন ছোটদের অনুষ্ঠান শুরু হয়, সেই সময় আমরা অন্য কোনো চ্যানেল দেখতে পেতাম না। দেখার সুযোগও ছিল না। পৃথিবীতে অন্য দেশের চ্যানেলে কী হয়, কিছুই জানতাম না। সেই সময় তিনি টেলিভিশনে প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানটি করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। দর্শকপ্রিয়তা তুঙ্গে রেখে। নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠান তিনি সারা দেশের স্কুলপড়–য়া খুদে অংশগ্রহণকারীকে সঙ্গে নিয়ে অকল্পনীয় সফলতার সঙ্গে আয়োজন করেছেন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি বাবার হাত ধরে আমিও অংশ নিতে যাই অভিনয় প্রতিযোগিতায়। গিয়ে তো আরও অবাক হওয়ার পালা।
আমার বাবাকে মুস্তাফা মনোয়ার সম্বোধন করে বললেন, ‘কেমন আছেন হক সাহেব?’
মাথা নাড়িয়ে জানালেন ভালো আছি, বললেন ‘আমার ছেলে অংশ নিতে চায়’।
শুনে খুশি হলেন। বললেন, ‘বেশ তো অংশ নাও। অভিনয়ে অংশ নেবে? খুব ভালো।’
এমন একজন ব্যক্তিত্বকে আমার বাবা চেনেন। সেটা জেনে আমি মনে মনে পুলকিত হলাম। অনুষ্ঠানে দুজন বিচারক। একজন ফতেহ লোহানী, আরেকজন তখনো আসেননি।
মুস্তাফা মনোয়ার জানালেন, আমার বাবাই আরেকজন বিচারকের দায়িত্ব পালন করবেন।
তাতে লাভের বদলে ক্ষতি হলো আমার মতো খুদে অংশগ্রহণকারীর।
মন্টু মামা জানালেন, ‘যেহেতু তোমার বাবা একজন বিচারকের আসন নিয়েছেন। তুমি এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না। বরং আবৃত্তি প্রতিযোগিতায়, পরের অন্য অনুষ্ঠানে আরেক দিন অংশ নেবে।’
তাই হলো। বাদ পড়ে যেতে হলো আমাকে। এটাও দেখেছি, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে কোথায় কোনো জায়গায় লাইট বসবে সেটিও তঁর নজর এড়াত না। প্রয়োজনে তিনি নির্দেশ দিতেন। আশ্চর্য ক্ষমতা দেখেছি তার আলোকসম্পাতে। কোথায় লাইট পড়বে। আলো কোথায় পড়লে নায়ককে আরও বড় নায়কোচিত মনে হবে। লাইটের কারিশমায় ভিলেন হয়ে উঠবে আরও ভয়ংকর। সেটা তিনি জানতেন। স্টুডিওর সেট ঘুরে ঘুরে কলাকুশলীদেরও নির্দেশনা দিতেন। আর তাতেই অসাধারণ সব কাজ হতো ম্যাজিকের মতো। তিনি আসলেই টেলিভিশনের ম্যাজিশিয়ান। তার পরিকল্পনা আর ভাবনা একেকটি অনুষ্ঠান দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠে বিস্ময়কর ম্যাজিকের মতো।
বিটিভি ছাড়ার পর মুস্তাফা মনোয়ার বেশ কিছু কাজ করেছেন। তার মধ্যে একটা কাজ ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশনে থাকাবস্থায় তো ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ কিংবা ‘রক্ত করবী’র মতো বড় বড় নাটক তিনি করেছেন। চাকরি শেষ হওয়ার পর, যখন প্যাকেজ নাটকের জোয়ার, তখন তিনি একটা প্যাকেজ নাটক নির্মাণ করেন। সেই নাটকের শেষ দৃশ্যে ছিল একটা ধু ধু বিস্তৃত মাঠ। মাঠের মাঝখানে শুধু একটা দরজা। এ দরজাটি ব্যবহার করে মুস্তাফা মনোয়ার অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। দরজা দিয়ে বেরোলেই দেখা যাবে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশকে। দরজা দিয়েই তৈরি করতে হবে পথ। এমনই প্রতীকী অনেক কিছুই এই একটি মাত্র দরজার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে ছিলেন ওই নাটকটিতে!
এই যে শৈল্পিক উপস্থাপনা, সেটি কেবল একজন মুস্তাফা মনোয়ারের পক্ষেই সম্ভব।