জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্দেশ্যে নতুন লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। বর্তমানে এ হার ২০ শতাংশের কিছু বেশি। বৈশ্বিক বর্জ্য বাড়ার হারকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার এবং ভবন খাতে জ্বালানির ব্যবহার অন্তত ২৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ৮ থেকে ১৮ জুন জার্মানির বনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী এবং কপ-৩১-এর প্রেসিডেন্ট-ডেজিগনেট মুরাত কুরুম এ ঘোষণা দেন।
কপ-৩১ প্রেসিডেন্সির অ্যাকশন এজেন্ডার অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে ঘোষিত এ লক্ষ্যকে বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আনাতোলিয়া শহরে অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩১ সম্মেলনের আগে এ ঘোষণা আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল আরেকটি জলবায়ু-প্রতিশ্রুতি নয়, বরং প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য পূরণের বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। এর উদ্দেশ হলো পরিবহন, আবাসন ও শিল্প খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাহায্যে বিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে আরও সংহত করা।
সম্মেলনে মুরাত কুরুম বলেন, বর্তমানে বিশ্বে মোট জ্বালানির মাত্র ২০ শতাংশের কিছু বেশি বিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হারকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে একটি সম্মিলিত বৈশ্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যা বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলবে।
তিনি বলেন, অ্যাকশন এজেন্ডাই বাস্তবায়নের চালিকাশক্তি। পরিবহন, আবাসন ও শিল্প খাতসহ দৈনন্দিন জীবনকে (পরিবারকে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে) বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে অস্থির জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশি^ক পর্যায়ে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করাই আমাদের প্রেসিডেন্সির অন্যতম নির্ধারক বৈশিষ্ট্য হবে।
এ লক্ষ্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এবং আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইআরইএনএ) বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। সংস্থাগুলোর মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে বিদ্যুতায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি সম্মেলনে বৈশ্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়। কপ-৩১ প্রেসিডেন্সি ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বর্জ্য বাড়ার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এটি তাদের ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা শূন্য বর্জ্য উদ্যোগের অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের অপচয় বর্তমানে বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী। খাদ্যবর্জ্য থেকে উৎপন্ন মিথেন গ্যাস জলবায়ুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া ‘রেজিলিয়েন্ট সিটিজ’ কর্মসূচির আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে আবাসন খাতে জ্বালানির ব্যবহার অন্তত ২৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় কমানো, বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং নগর এলাকার কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্মেলনে মুরাত কুরুম ‘ক্লাইমেট ইমপ্লিমেন্টেশন ব্রিজ’ গড়ার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল এবং বিনিয়োগ অগ্রাধিকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়াবে। একই সঙ্গে জলবায়ু অর্থায়নকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।
বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য পূরণের জন্য কপ-৩১ প্রেসিডেন্সি অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় আইএইএকে দুটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছে। প্রথম প্রতিবেদনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুতায়ন ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার সম্ভাব্য পথনকশা তুলে ধরা হবে। দ্বিতীয় প্রতিবেদনে বৈশি^ক বর্জ্য কমানো এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির সুফল বিশ্লেষণ করা হবে। তার আগে আইআরইএনএ-এর সঙ্গে যৌথভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণে বিদ্যুতায়নের ভূমিকা নিয়ে কাজ শুরু করেছে কপ-৩১ প্রেসিডেন্সি।
অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন বলেন, জ্বালানি রূপান্তরের গতি বাড়ালে অর্থনীতি ও পরিবার উচ্চ ব্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং নির্গমন কমানোর প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে। তার মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিদ্যুতায়িত করা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিঃসরণ কমানো ও ব্যয় কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।
জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি)-এর নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল বলেন, বিদ্যুতায়ন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বৈশ্বিক উত্থান ঘটিয়েছে, যা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরায় বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভর করে তোলার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা সংহত করা সম্ভব হবে।
আইএইএ’র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, বিশ্ব দ্রুত বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন দেশ অর্থনীতিকে বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং নিঃসরণ কমাতে সক্ষম হবে।
আইআরইএনএ-এর মহাপরিচালক ফ্রান্সেস্কো লা ক্যামেরা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুতায়ন এবং আধুনিক বিদ্যুৎগ্রিডের উন্নয়নই ২০৩৫ সালের লক্ষ্য অর্জনের মূলভিত্তি।
কপ-৩১ প্রেসিডেন্সির মতে, বিদ্যুতায়নের নতুন লক্ষ্য বৈশ্বিক জ্বালানির রূপান্তরের কাঠামোকে আরও কার্যকরী করবে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে জ্বালানির ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তন আনবে। সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শহর প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে একত্রিত করে বাস্তবভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খোঁজার গতি বাড়ানোই হবে এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। কপ-৩২ এবং তার পরেও ২০৩৫ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি গড়ে তোলাই এখন বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বনের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে কপ-৩১ অ্যাকশন এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়। এতে কপ-২৮-এর নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিনগুণ বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণবিষয় সুপারিশের বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়। এ ছাড়া কপ-২৯ সম্মেলনে জ্বালানি সংরক্ষণ, বিদ্যুৎগ্রিডের আধুনিকায়ন এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।