‘লালনের গানের ৬৫ শতাংশ আমার সুরের’

 শফি মণ্ডলের মন্তব্যে উত্তপ্ত সংগীতাঙ্গন

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

`বর্তমানে প্রচলিত লালনের গানের ৬৫ শতাংশ আমার সুরে গাওয়া হয়'- এমন মন্তব্য করে সংগীতাঙ্গনে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন লোকসংগীত শিল্পী শফি মণ্ডল। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে তিনি দাবি করেন, এরপর থেকেই শিল্পী, গীতিকার, গবেষক ও বাউলশিল্পীদের একাংশ তার এই দাবির তীব্র সমালোচনা করছেন। 

অনুষ্ঠানে শফি মণ্ডল বলেন, ‘লালন ফকিরের সব গান তিনি সুর করে গেছেন, এটা সত্য। কিন্তু সেই সুর সংরক্ষণ করা হয়নি। বর্তমানে প্রচলিত লালনের গানের ৬৫ শতাংশ আমার সুরে। আমার মনে হয় যেন লালন আমাকে এই দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।’ 

মূলত, এই বক্তব্যের পর সামাজিকমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান তরুণ সংগীতশিল্পী মমিন বিশ্বাস। ফেসবুকে তিনি লেখেন, শফি মণ্ডলের গায়কীর প্রতি তার শ্রদ্ধা রয়েছে, তবে লালনের ৬৫ শতাংশ গানের সুরকার দাবি করা ইতিহাসসম্মত নয়। তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি যদি বলি রবীন্দ্রনাথের ৬৫ শতাংশ গানের সুরকার আমি, তাহলে সেটাও একই ধরনের দাবি হবে।’ 

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার সোমেশ্বর অলিও বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘লালন ফকিরের যত গান আছে তার ৬৫ শতাংশ আমার টিউন করা-এমন দাবি আগে কখনো শুনিনি।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে এমন একটি বক্তব্যের সঙ্গে উপস্থাপকও একমত হলেন। 

তবে শফি মণ্ডলের পক্ষে কথা বলেছেন কয়েকজন। মেজবা সুফিয়ান নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘গুরুজি শফি মণ্ডল যে লালন সাঁইজির অনেক গানের সুর করেছেন, এটা মানতে সবার এত কষ্ট হচ্ছে কেন?’ 

শিল্পী রাজু মণ্ডলও শফি মণ্ডলের বক্তব্যের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি জানান, শফি মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন-ফরিদা পারভীনের পর বাংলাদেশে যে লালনগানগুলো জনপ্রিয় হয়েছে, তার বড় একটি অংশে তার নিজস্ব সংগীতায়োজন বা কারুকাজ রয়েছে। ৬৫ শতাংশ বলতে তিনি সেই অবদানকেই ইঙ্গিত করেছেন। 

বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের বড় অংশ এ ব্যাখ্যায়ও সন্তুষ্ট নন। লোকসংস্কৃতি গবেষক ও নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া বলেন, গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী লালন ফকিরের গানের সংখ্যা প্রায় ৬৫০। তার ভাষ্য, লালন নিজের গান নিজেই সুর করতেন। সময়ের সঙ্গে পরিবেশনায় কিছু পরিবর্তন এলেও মূল সুর লালনেরই। তাই লালনের গানের সুরকার হিসেবে অন্য কারও দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, কেউ যদি নিজের মতো করে নতুন সুরে লালনের গান পরিবেশন করেন, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু সেটিকে লালনের গানের মূল সুর হিসেবে দাবি করা ইতিহাসসম্মত নয়। 

একই মত দিয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ফোকলোরবিদ ও সংগীতগবেষক ড. তপন বাগচী। তিনি বলেন, লালন, হাসন রাজা, রাধারমণ, বিজয় সরকার কিংবা আব্দুল করিম-এ ধরনের লোককবিরা নিজেরাই গান রচনা ও সুর করেছেন। ফলে তাদের গানের সুরকার হিসেবে অন্য কারও নাম আসার সুযোগ নেই। তপন বাগচীর মতে, শফি মণ্ডল হয়তো ‘পরিবেশন’ বা নিজের ঢঙে গাওয়া বোঝাতে গিয়ে ‘টিউন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে লালনসংগীত শিল্পী টুনটুন বাউলও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘দেশের মানুষ জানে কে কী করেছে। এসব ছোট মনের পরিচয়।’ 

যদিও সমালোচনার মুখেও নিজের বক্তব্য থেকে পুরোপুরি সরে আসেননি শফি মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘কথাটি আবেগের বশে বলেছি, তাই অহংকার মনে হয়েছে। তবে আমি বলতে চেয়েছি, বর্তমানে প্রচলিত লালনের গানগুলোর ৬৫ শতাংশ আমার সুরে গাওয়া হয়।’ তিনি আরও দাবি করেন, লালনের আদি সুরের বেশিরভাগই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। তার ভাষায়, ‘শুধু ফরিদা পারভীনের গাওয়া দেড়শর মতো গানের সুর সংরক্ষিত ছিল। বাকি গানগুলো নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত