শুভবোধের জয় হোক

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৯ এএম

স্বীকার করতেই হবে, জাতীয়তার প্রধান উপাদান হচ্ছে ভাষা। ভাষাই আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্প্রীতির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নিকটবর্তী করে তোলে। তবে এটাও অসত্য নয়, শ্রেণি প্রশ্নে আবার দূরবর্তীও করে দেয়। ভাষা সংস্কৃতির অনিবার্য উপাদান বটে। জাতিভেদে ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিন্নতা বিশ^ব্যাপী রয়েছে। ভাষার সংকটই যে জাতীয়তার সংকট সেটা তো বাস্তবিক সত্য। আমরা আমাদের জাতীয়তার সংকটের মীমাংসা করেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের মূল উপাদান ছিল জাতীয়তা, বাঙালি জাতীয়তা। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র নয়। কেননা বাংলাদেশে অসংখ্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে। তাদের জাতীয়তাকে উপেক্ষা করার অর্থ দাঁড়াবে পাকিস্তানবাদিতা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই আমাদের মাতৃভাষা হরণে উর্দু ভাষা চাপানোর ঘৃণ্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বয়ং জিন্নাহ। সে চেষ্টা সফল হতে পারেনি। আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-আত্মত্যাগে আমরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি আদায় করেছিলাম।

ওই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতীয়তাবাদী দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে এবং প্রতিবেশী ভারতের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত করেছিলাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে আমরা জাতীয়তার মীমাংসা নিশ্চিত করেছিলাম। অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে জাতীয়তার মীমাংসা সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমাদের পরবর্তী করণীয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবায়নে সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ অবলম্বনে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমাদের জাতীয়তাবাদী শাসকরা ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর আর অগ্রসর না হয়ে অতীতের ব্যবস্থাকে অক্ষুণœ রেখে মুক্তির অভিযাত্রা থামিয়ে দিয়েছিলেন, এই অভিযোগ তো আছেই। সংবিধান প্রণয়নের সময় রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের তিন প্রধান স্তম্ভে জাতীয়তাবাদকে যুক্ত করেছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার অগ্রে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অস্থায়ী সরকার ঘোষণা দিয়েছিল স্বাধীন দেশে তিন প্রধান স্তম্ভের কথাই। কিন্তু জাতীয়তাবাদী শাসকরা মীমাংসিত জাতীয়তাবাদকেই প্রধান করার ফলে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা করলেন। এর ফলে স্বাধীনতা এলেও সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি অধরাই রয়ে গেছে।

ধর্মীয় ঐক্যের চেয়েও শক্তিশালী হচ্ছে জাতীয়তার ঐক্য। এর বহু প্রমাণ আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই রয়েছে। ভাষার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সম্প্রদায়গত বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল; হিন্দুস্তানি কথ্য ভাষাকে জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের ফলে। পরবর্তী সময় একজাতিতত্ত্ব জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব হাজির না করলে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব ঘটত কিনা সন্দেহ আছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ভারত-বিভাগও ঘটার সুযোগ লাভ করত কিনা সন্দেহ থেকে যায়। তবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দেশভাগের মূলে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসক এবং তাদের অনুগত রাজনীতিকরা ক্ষমতার ভাগাভাগির তাগিদে সম্পন্ন করেছিল। বাংলা ভাগের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন হিন্দু মহাসভার প্রধান এবং ব্রিটিশদের তাঁবেদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। স্বাধীন দেশে বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা হয়েছে সত্য। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন কি হয়েছে? না, হয়নি। ঔপনিবেশিক ভাষার দৌরাত্ম্য সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, বাংলা ভাষা পরিত্যাগে। আমাদের শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের ছবিটি আরও জাজ¦ল্যমান আমাদের ত্রিমুখী শিক্ষাক্রমে। বিত্তবান শ্রেণির ইংরেজি, সাধারণের মাধ্যমিক এবং দরিদ্র শ্রেণির মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমই আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে নির্ধারিত হয়ে আছে।

ব্রিটিশ শাসনাধীন আসামে ১৮৩৬ সালে বাঙালি আমলাদের প্ররোচনায় ব্রিটিশ সরকার রাজ্যের সরকারি ভাষা অসমীয়া ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পর হতে বাঙালি ও অসমীয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। শিক্ষাঙ্গনে, আদালতের অসমীয়া ভাষা পরিত্যক্ত হয় এবং বাংলা ভাষা রাজ্যের সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রাপ্তিতে অসমীয়রা বাঙালি-বিদ্বেষী হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সরকারের বাঙালি আমলারা সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল অসমীয়া ভাষা বাংলা ভাষারই উপভাষা। অসমীয়া ভাষা কোনো স্বতন্ত্র ভাষা নয়। বাঙালি আমলারা একই কাজ করতে চেয়েছিল উড়িষ্যাতেও। কিন্তু সফল হয়নি। বাংলা এবং অসমীয়া ভাষার বর্ণমালার মধ্যে একমাত্র ‘র’ বর্ণটি ছাড়া আর কোনো পার্থক্য নেই। পরে অবশ্য ব্রিটিশ সরকার অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু অসমীয়রা বাঙালিদের ওপর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব অদ্যাবধি ত্যাগ করতে পারেনি। আসামে বাঙালিরা দ্বিতীয় বৃহত্তর জাতি। বরাক উপত্যকার কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে বাঙালি জনসংখ্যা ৭৫ শতাংশ। ১৯৬১ সালে রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর রাজ্যের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার গুলি করে হত্যা করে নারীসহ সাতজন আন্দোলনকারী বাঙালিকে। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় ব্যাপক বিক্ষোভ ঘটে। বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার সঙ্গে আসামের ঘটনার সদৃশ্য রয়েছে পূর্ব বাংলা এবং আসাম রাজ্যের বাঙালিরা উর্দু এবং অসমীয়া ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে দেশ ও রাজ্যের অন্যতম রাষ্ট্র ও সরকারি ভাষার দাবি তুলেছিল। ভাষা এবং সম্প্রদায় বিভক্তিতে সংখ্যালঘুরা দেশে দেশে সংখ্যাগুরুদের দ্বারা আক্রান্ত এবং নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে।

সম্প্রদায় ও জাতীয়তার ভিন্নতার নানা সংকট বিশ্বজুড়ে বিরাজমান। সম্প্রদায় ও জাতীয়তার বিভক্তির সহিংসতাগুলো অতিশয় উদ্বেগের, তাতে সন্দেহ নেই। উগ্র জাতীয়তাবাদ কত ভয়ংকর হতে পারে তার নমুনা এখন বিশ^জুড়ে দৃশ্যমান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হিংস্রতা জাতীয়তাবাদী হিটলার, মুসোলিনিদের পর্যন্ত হার মানিয়েছে। এমন বহু নজির আছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের দিকে। ইতিহাসে উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল অধ্যায় আছে বটে, কিন্তু উজ্জ্বল অধ্যায়ই আমাদের অনুপ্রেরণার শক্তি জোগায়। এই শক্তিই আমাদের ভবিষ্যতের পথ মসৃণ করবে। জয় হবে শুভবোধসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর। শুভবোধের পরাজয় ঘটে না, কখনোবা আক্রান্ত হতে পারে; কিন্তু পরাজয় ঘটে না। এরও নজির ইতিহাসে কম নেই। অর্থাৎ শুভবোধের ক্ষয় নেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত