ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়া ও অসচেতনতা

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪১ এএম

ওষুধের ব্যবহার ও এর পাশর্^প্রতিক্রিয়া নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই খবর আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় এ জন্য মানুষের অসচেতনতা দায়ী। এই প্রেক্ষাপটেই আজকের এ লেখা। রোগ প্রতিরোধ-প্রতিকারে আমরা ওষুধ ব্যবহার করি। সঠিক সময় সঠিক মাত্রায় সঠিক ওষুধটি প্রয়োগ করলে আমরা অল্প ওষুধেই সুফল পেয়ে থাকি ও সুস্থ হয়ে ওঠি। ওষুধের রোগ সারানোর অপূর্ব ক্ষমতাকে শুধু আমরা ধর্তব্যের মধ্যে নিয়ে থাকি। কিন্তু রোগ সারানোর পাশাপাশি ওষুধ আমাদের শরীরে মারাত্মক পাশর্^প্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা অনেকেই আমরা মনে রাখি না। কোনো কোনো সময় পাশর্^প্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এবং এর ফলে মানুষ মারাও যেতে পারে। এ বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে। মনে রাখা উচিত, ওষুধ সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো কোনো পণ্য নয়। ওষুধ দেওয়া বা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। উন্নত বিশ্বে ওষুধ ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। কেউ ওষুধের দোকান থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ওষুধ কিনতে পারে না। আমাদের দেশে ওষুধ ক্রয়-বিক্রয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে কোনো ওষুধ প্রদান ও ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টের সুস্পষ্ট পরামর্শ থাকা বাধ্যতামূলক, নয়তো ওষুধ গ্রহণ বিপজ্জনক হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক, হƒদরোগ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের ওষুধ, ঘুমের ওষুধ, আসক্তি সৃষ্টিকারী ওষুধ, ট্রাংকুইলাইজার, মৃগী রোগের ওষুধসহ আরও অসংখ্য ওষুধ এ শ্রেণিভুক্ত। এমন কিছু ওষুধ আছে, দৈনন্দিন জীবনে যেগুলোর ব্যবহার ব্যাপক হলেও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এসব ওষুধ কিনতে প্রেসক্রিপশনের দরকার হয় না। এসব ওষুধকে ওভার দি কাউন্টার (ওটিসি) ড্রাগ বলা হয়। 

প্যারাসিটামল, এন্টাসিড, ভিটামিন, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ এ শ্রেণিভুক্ত। রোগীকে ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্যই ওষুধের এ শ্রেণিবিভাগ এবং ক্রয়-বিক্রয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

ওষুধ শরীরের জন্য বহিরাগত একটি রাসায়নিক পদার্থ এবং প্রতিটি বহিরাগত রাসায়নিক পদার্থেরই শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়াসহ বিষক্রিয়া থাকা স্বাভাবিক। ওষুধের যুক্তিসংগত প্রয়োগের মাধ্যমে এ ক্ষতিকর পাশর্^প্রতিক্রিয়াগুলো যথাসম্ভব ন্যূনতম রেখে রোগীকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সুফল প্রদানের প্রচেষ্টাই চিকিৎসা বিজ্ঞানের আসল লক্ষ্য। একটি ওষুধের রিস্ক বেনিফিট অনুপাত যত কম হবে রোগীর জন্য তত মঙ্গল। কোনো কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে রিস্ক বেনিফিট অনুপাত ব্যবধান কম হওয়া সত্ত্বেও ওষুধ হিসেবে এগুলোর কোনো বিকল্প থাকে না বলে রোগীর জীবন রক্ষার জন্য এসব ওষুধ আবশ্যক হয়ে পড়ে। এসব ওষুধ ব্যবহারের ফলে রোগী পাশর্^প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংক্রামক রোগের চিকিৎসা শুরুর আগে চিকিৎসককে জীবাণু তত্ত্বীয় পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করতে হয় রোগী কোন জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত এবং সেই জীবাণু বা জীবাণুগুলো কোন কোন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। এ ধরনের পরীক্ষা সম্পন্ন না করেই যত্রতত্র যখন-তখন বিভিন্ন মাত্রায় যুক্তিহীন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অনেক জীবাণু ইতিমধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রোধ করে বা ধ্বংস করে সফল চ্যালেঞ্জার হিসেবে টিকে থাকার দক্ষতা ও ক্ষমতা অর্জন করেছে। জীবাণুর এ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন আগামী শতাব্দীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হবে। পর্যাপ্ত সংখ্যক নতুন নতুন কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত না হলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানবসভ্যতাকে সমূহ বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ওভার দি কাউন্টার ড্রাগ নয়, প্রেসক্রিপশন ড্রাগ। সুতরাং নিরাপদ ও সফল কার্যকারিতা লাভের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের আগে সর্বপ্রকার সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক অতিমাত্রায় ব্যবহার যেমন ক্ষতিকর, কম মাত্রায় গ্রহণ তেমনি বিপজ্জনক।

একটি বা দুটি প্যারাসিটামল খেলে ব্যথা সারে বলে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, একটি বা দুটো অ্যান্টিবায়োটিক খেলে সংক্রামক রোগ সারবে। প্রত্যেক সংক্রামক ব্যাধির জন্যই চিকিৎসক প্রদত্ত নির্বাচিত ওষুধটি নির্ধারিত মাত্রায় নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে নির্দিষ্ট দিনের জন্য গ্রহণ করতে হবে। এর কমও নয়, বেশিও নয়। নির্ধারিত মাত্রায় কম ওষুধ খেলে জীবাণু নির্মূল হবে না। ওষুধ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম হলে রোগীর ভোগান্তি ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের প্রদত্ত দুই-

তৃতীয়াংশ ওষুধই অপ্রয়োজনীয় বা সামান্য প্রয়োজনীয়। বিভিন্ন দেশে অধিকাংশ শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়াকে দায়ী করা হয়েছে। আমরা প্রায়ই শিশুদের প্রকৃত সমস্যা বুঝতে পারি না। শিশুরা অসুস্থ হলে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হই। আমাদের ধারণা ওষুধ রোগ সারায়, কিন্তু ওষুধ যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে, তা আমরা খুব কমই উপলব্ধি করতে পারি। শিশুরা সাধারণত ডায়রিয়া, কফ, ঠা-া লাগার মতো কয়েকটি সাধারণ রোগে বেশি ভুগে থাকে। সনাতনী ধারণা থেকে শিশুদের এসব রোগে যেসব ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, তার অধিকাংশই অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর। অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধে ঘুমের প্রভাব থাকায় শিশুরা এ ধরনের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে এবং বাবা-মা নিশ্চিত হয় এই ভেবে যে, তাদের শিশু সুস্থ হয়ে উঠছে। এ ধারণা ঠিক নয়। শিশুদের ওপর অ্যান্টিহিস্টামিন বা সেডেটিভ জাতীয় ওষুধের সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া মোটেই কাক্সিক্ষত নয়।

ওষুধের প্রতি সহনশীলতা, কার্যকারিতাও স্বভাবতই আলাদা। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী মায়েদের ওষুধ প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী মায়েদের ওপর পর্যাপ্ত গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পাদনে সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে এখনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, অনুমান ও নিজস্ব চিন্তাভাবনার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় তথ্য ছাড়াই চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ওষুধের ছাড়পত্র দিতে হচ্ছে। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে ওষুধের অযৌক্তিক ব্যবহার বন্ধ করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।

ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কিছু বিষয় লক্ষ রাখা খুব জরুরি। শুধু প্রয়োজনেই ওষুধ সেবন করুন। অপ্রয়োজনে কখনোই ওষুধ সেবন করবেন না। এটা রোগীর জন্য ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক হতে পারে। তিন. সুস্থবোধ করলেও ওষুধের নির্দিষ্ট কোর্স সমাপ্ত করুন। কোনো মতেই কোর্স সমাপ্ত না করে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করবেন না। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কোর্স সমাপ্ত না করলে পরবর্তী সময় মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বেশি মাত্রায় বা বেশি ওষুধ খেলে বেশি ফল পাওয়া যাবে এ ধারণা ঠিক নয়। আবার নির্দিষ্ট মাত্রার কম ওষুধ খেলেও অসুখ সারবে না। রোগ ও ওষুধের ব্যাপারে চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টরাই বিশেষজ্ঞ। গর্ভবতী মহিলাদের বেলায় ওষুধ গ্রহণ বা প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। কারণ ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়া বা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে গর্ভজাত সন্তানের ক্ষতি ও জীবন বিপন্ন হতে পারে। কোনো কোনো সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে আত্মচিকিৎসা গ্রহণযোগ্য হলেও নিয়ন্ত্রণহীন আত্মচিকিৎসা ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেমন ব্যথা বা জ¦র নিয়ন্ত্রণে মাত্রাতিরিক্ত প্যারাসিটামল ব্যবহার লিভার ও কিডনি ধ্বংসের কারণ হতে পারে। অননুমোদিত দোকান থেকে ওষুধ কিনবেন না। ওষুধের গায়ে খুচরা বিক্রয় মূল্য, ব্যাচ নম্বর, এক্সপায়ার ডেট ঠিক আছে কিনা দেখে ওষুধ কিনুন। ভুয়া, নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ থেকে সাবধান। মাঝে মাঝে এ রকমও দেখা যায়, বিক্রেতারা প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত কোনো বিশেষ ওষুধ স্টোরে বা সরবরাহ নেই বলে অন্য ব্র্যান্ডের কম গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ বিক্রি করতে চায়। 

ভিটামিনের চেয়ে অ্যান্টিবায়োটিক আপনার সুস্থতার জন্য বেশি প্রয়োজনীয়। ড্রাগ স্টোরের ওষুধ বিক্রেতাদের এই অশুভ ও অনৈতিক মানসিকতা সম্পর্কে সচেতন থাকুন। ওষুধের সঙ্গে দেওয়া লিফলেটে প্রদত্ত তথ্যাবলি আপনার কাজে আসতে পারে। তাই লিফলেটটি সংরক্ষণ করুন এবং ভালোভাবে পড়ুন। ইনজেকশনের ক্ষেত্রে ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ নিরাপদ। নকল বা ব্যবহƒত ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। বহু ব্যবহƒত সিরিঞ্জের মাধ্যমে অনেক মারাত্মক রোগ সংক্রমিত হয়। অনেকে হয়তো জানেন না, নকল ও ব্যবহƒত ডিসপোজিবল সিরিঞ্জ রিপ্যাক হয়ে আবার বাজারে বিক্রি হয়। অন্যের ওষুধ সেবন করবেন না বা আপনার ওষুধ অন্যকে ব্যবহার করতে দেবেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়ে সেবাযতœ ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন রোগীর জন্য বেশি উপকারী হতে পারে। বিশুদ্ধ পানি ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা আপনাকে বহু রোগ থেকে রক্ষা করবে। কোনো ওষুধ গ্রহণের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যেকোনো কারোর ওষুধের প্রয়োজনীয়তা-ব্যবহার ইত্যাদি সবই হতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হতে পারে খুব বিপজ্জনক। নিজে নয়, চিকিৎসকের পরামর্শে খেতে হবে ওষুধ।

লেখক : জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশেষজ্ঞ, সাবেক অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত