স্পেন ও পর্তুগালে মুসলিম সভ্যতা বিকাশের নায়ক

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম

মধ্যযুগে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) মুসলিম নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে আল-আন্দালুস বলা হতো। তৎকালীন সেই অঞ্চলে শিল্প, সাহিত্য ও নান্দনিকতার অপূর্ব মিলন ঘটেছিল। এর অন্যতম নায়ক ছিলেন উমাইয়া বংশের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী প্রথম মুহাম্মদ। মেধা-মননের উৎকর্ষ দিয়ে তিনি সাম্রাজ্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তার হাত ধরেই ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। 

তিনি ছিলেন দ্বিতীয় আবদুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। শৈশব থেকেই তিনি আল-আন্দালুসের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র কর্ডোভার রাজপ্রাসাদে অত্যন্ত রাজকীয় ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি কোরআন, ইসলামি আইনতত্ত্ব, আরবি সাহিত্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। পিতার মৃত্যুর পর ৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আল-আন্দালুসের শাসনভার গ্রহণ করেন।

তার শাসনামলে স্পেনে ইসলামি সংস্কৃতি ও শিক্ষার অভাবনীয় প্রসার ঘটে। তিনি নিজে অত্যন্ত শিক্ষিত ও মার্জিত রুচির অধিকারী ছিলেন এবং ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। তার পৃষ্ঠপোষকতায় কর্ডোভা হয়ে ওঠে পণ্ডিত, কবি ও জ্ঞানপিপাসুদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। জ্ঞানচর্চার এই বিস্তারে উমাইয়া রাজদরবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাচ্য থেকে অনেক বিদ্বান ব্যক্তি এ সময় স্পেনে আগমন করেন এবং এখানে দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের এক নতুন ধারা তৈরি করেন।

তিনি শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করেছিলেন, যা পুরো সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ নিয়ে আসে। তার সময়ে স্পেনে বসবাসরত আরব, নও মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে এক অভিনব মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকে। প্রশাসনিক দক্ষতা, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে তার সময়ে স্পেনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। কর্ডোভা হয়ে ওঠে সেই সময়ের ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ ও অগ্রসর নগরী।

স্থাপত্যশিল্পে তার অবদান ছিল সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সুদূরপ্রসারী। কর্ডোভার ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মসজিদ বা কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণে তার ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তার পিতা দ্বিতীয় আবদুর রহমান এই মসজিদের যে ব্যাপক সংস্কার ও বিস্তৃতি শুরু করেছিলেন, প্রথম মুহাম্মদ তা পরম যত্নের সঙ্গে সমাপ্ত করেন। তার নির্দেশে মসজিদে শাসকদের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত স্থান নির্মিত হয়।

কেবল রাজধানী কর্ডোভাতেই নয়, সাম্রাজ্যের সীমান্ত সুরক্ষায়ও তিনি অসামান্য স্থাপত্যকীর্তি রেখে গেছেন। উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষার জন্য তিনি নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে একটি সামরিক দুর্গ নির্মাণ করেন। মায়রিত নামের সেই সামরিক ঘাঁটিকে কেন্দ্র করেই আধুনিক মাদ্রিদ শহরের গোড়াপত্তন হয়। এছাড়া তার স্ত্রী উম্মে সালামার উদ্যোগে কর্ডোভার উত্তরাংশে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ এবং একটি বিশাল গোরস্থান নির্মিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে শহরের সবচেয়ে বড় সমাধিক্ষেত্রে পরিণত হয়।

কূটনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি অনন্য যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। সাম্রাজ্যের ভেতরে নানা সময়ে বিদ্রোহ দেখা দিলেও তিনি কঠোর হস্তে তা দমন করেন। বিশেষ করে টলেডো শহরের বিদ্রোহ, বানু কাসি পরিবারের ক্রমাগত বিরোধিতা এবং উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর আগ্রাসন তিনি সফলভাবে প্রতিহত করেছিলেন। ৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পাম্পলোনার শাসক গার্সিয়া ইনিগেসের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং ইব্রো উপত্যকায় উমাইয়াদের আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করেন।

সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়নে প্রথম মুহাম্মদের উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। তিনি সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীকে সুশৃঙ্খল করেন এবং তার আমলে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজারে উন্নীত হয়। এর একটি বড় অংশ ছিল সিরীয় বংশোদ্ভূত নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধা। এই সামরিক শক্তির ওপর ভর করেই তিনি স্পেনে মুসলিম শাসনকে সুসংহত করেন এবং জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও নান্দনিকতার একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্পেনের বুকে এক সোনালী যুগের বীজ বপন করে গিয়েছিলেন।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত