মাঠের জয়ও যে কখনো কখনো আস্ত একটা দেশের জন্য অভিশাপ হয়ে নামতে পারে, ফুটবল দুনিয়া তা টের পেয়েছিল ঠিক ৩২ বছর আগে। সেই চেনা প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড যখন আবার ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউটে কলম্বিয়ার সামনে, তখন ভ্যানকুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামের আবহ স্রেফ কোনো সাধারণ ম্যাচে সীমাবদ্ধ নেই। এই দ্বৈরথ ফুটবল ইতিহাসের পাতা থেকে টেনে আনছে বেদনাবিধুর এক অন্ধকার অধ্যায়কে। আজ থেকে ঠিক ৩২ বছর আগে, ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে এই দুই দল যখন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল, তখন স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়ামের ঘাসে রোপিত হয়েছিল এক ট্র্যাজেডির বীজ। সেই ম্যাচে কলম্বিয়া ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু মাঠের সেই জয় আড়ালে ঢেকে দিয়েছিল লাতিন দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এক অভিশাপকে।
ম্যাচটি জিতেও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছিল কলম্বিয়া, যার খেসারত হিসেবে দেশে ফেরার মাত্র কয়েকদিন পর ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবারকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়Ñ যার একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে করা একটি আত্মঘাতী গোল। দীর্ঘ তিন দশক পর, উত্তর আমেরিকার সেই একই মাটিতেই আবার যখন এই দুই দল নকআউটের মহাগুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে মুখোমুখি, তখন কলম্বিয়ার সামনে অতীত ট্র্যাজেডির সেই দীর্ঘ ছায়া মাড়িয়ে প্রতিশোধের বৃত্ত পূরণের সুযোগ। আর অন্য প্রান্তে, সুইসদের সামনে ইতিহাসকে নতুন করে রাঙিয়ে নেওয়ার এক চরম হাতছানি।
দুই দলই এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থেকে শেষ ষোলোতে পা রেখেছে। তবে তাদের খেলার ধরন সম্পূর্ণ বিপরীত। মুরাত ইয়াকিনের অধীনে সুইজারল্যান্ড এবার তাদের চেনা রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে এক দারুণ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। গ্রুপ পর্বে কাতারকে রুখে দেওয়ার পর বসনিয়াকে ৪-১ এবং সহ-স্বাগতিক কানাডাকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর শেষ বত্রিশের ম্যাচে আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা ৮৮ বছর পর বিশ্বকাপে টানা তিনটি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়ে। অন্যদিকে নেস্তর লরেঞ্জোর কলম্বিয়া এবার টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’। উজবেকিস্তান ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোকে হারানোর পর পর্তুগালের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে তারা গ্রুপ শীর্ষস্থান ধরে রাখে এবং শেষ বত্রিশে ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে নকআউটে আসে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল হজম করা কলম্বিয়ার রক্ষণভাগ যেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
কৌশলগতভাবে এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে সুইসদের গতি বনাম কলম্বিয়ান রক্ষণশীলতার এক চরম পরীক্ষা। সুইজারল্যান্ডের আক্রমণের মূল চাবিকাঠি ২০ বছর বয়সী তরুণ সেনসেশন জোহান মানজাম্বি, যিনি টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৩টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করে ড্যান এনদয়ে এবং রুবেন ভারগাসদের সঙ্গে এক ভয়ংকর আক্রমণভাগ গড়ে তুলেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে এমবোলোর গোলটির পেছনেও ছিল মানজাম্বির দারুণ ডিফেন্স-চেরা দৌড়। সুইস ফরোয়ার্ড ড্যান এনদয়ে সেসব টেনে আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, ‘আমাদের এই নতুন প্রজন্ম যেন এক ঝলক তাজা বাতাস। আমরা দেখিয়েছি যে আমরা শুধু রক্ষণভাগ সামলাতেই জানি না, আকর্ষণীয় আক্রমণাত্মক ফুটবলও খেলতে পারি। জোহান (মানজাম্বি) আমাদের দলে এক অন্যরকম প্রাণ এনে দিয়েছে।’
তবে কলম্বিয়ার দুর্ভেদ্য ডিফেন্স ভাঙা সুইসদের জন্য মোটেও সহজ হবে না। যদিও কলম্বিয়া শিবিরে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে তাদের মূল স্ট্রাইকার জন কর্দোবার হ্যামস্ট্রিং চোট, যার কারণে তিনি বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছেন। তার জায়গায় স্পোর্টিং সিপির লুইস সুয়ারেজ আক্রমণভাগের হাল ধরবেন, যেখানে তাকে সাহায্য করবেন মহাতারকা লুইস দিয়াজ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী হামেশ রদ্রিগেজ। তবে কলম্বিয়ার একমাত্র দুশ্চিন্তা হলো তাদের গোল করার দুর্বলতা; প্রতি ম্যাচে ২০টির বেশি শট নিলেও তাদের গোল করার দক্ষতার পরিসংখ্যানে টুর্নামেন্টের অন্যতম সর্বনিম্ন।
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্যালারির আবহ নিয়েও বেশ সতর্ক সুইস শিবির। সুইস মিডফিল্ডার আরদন জাশারি মনে করেন, গ্যালারিতে কলম্বিয়ান সমর্থকদের তৈরি করা লাতিন উন্মাদনা তাদের জন্য টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
মাঠ ও গ্যালারির এই দ্বিমুখী চাপ সামলাতে কৌশলগত পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দুই দলের মাস্টারমাইন্ডরাও। সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন প্রতিপক্ষের শক্তির জায়গা উল্লেখ করে বলেন, ‘কলম্বিয়া অত্যন্ত টেকনিক্যাল ও মানসম্পন্ন একটি দল। মাঠের ভেতর ওদের তীব্রতা এত বেশি যে যেকোনো মুহূর্তে ওরা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আমরা যদি এই বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই, তবে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে সলিড পারফর্ম করতে হবে।’
অন্যদিকে কলম্বিয়ার কোচ নেস্তর লরেঞ্জো প্রতিপক্ষকে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছেন না। সুইসদের শক্তিশালী রক্ষণ ও পরিকল্পিত আক্রমণকে সমীহ করে তিনি বলেন, ‘সুইজারল্যান্ড অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং গোছানো একটি দল। ওরা যেমন ভালো ফুটবল খেলে, তেমনি ওদের ফাইনাল থার্ডেও (আক্রমণভাগে) বেশ কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে। নিশ্চিতভাবেই এটি আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন একটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে।’
সুইজারল্যান্ডের সামনে সুযোগ ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার বাধা ডিঙানোর, যেখানে অতীতে ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালে তারা এই শেষ ষোলোর মঞ্চ থেকেই বিদায় নিয়েছিল। এদিকে যে উত্তর আমেরিকার মাটিতে কলম্বিয়ান ফুটবলের এক মহাতারকাকে হারাতে হয়েছিল, সেখানেই ৩২ বছর পর এক নতুন ইতিহাস লিখতে মুখিয়ে আছে দিয়াজ-রদ্রিগেজরা। আর এই ম্যাচের জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অথবা মিসরের।