দেশে প্রথমবারের মতো দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত ‘দিনাজপুর মিনি চিড়িয়াখানা ও পার্কে’ উটপাখির ডিম থেকে ৬টি বাচ্চা ফুটেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এটি দেশের কোনো মিনি চিড়িয়াখানায় উটপাখির সফল প্রজননের প্রথম ঘটনা।
মরু অঞ্চল ও আফ্রিকার বনাঞ্চলে বসবাসকারী উটপাখিগুলো বর্তমানে পার্কটিতে স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করছে। সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলো খাবার খাচ্ছে, দৌড়াদৌড়ি করছে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে।
সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যায় দিনাজপুর জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম এবং জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) ডা. মো. আব্দুর রহিম দিনাজপুর মিনি চিড়িয়াখানা ও পার্ক পরিদর্শন করেন।
চিড়িয়াখানার মালিক প্রকৌশলী রইচ উদ্দীন মিঞা বাবুল জানান, প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে ঢাকা থেকে দুটি উটপাখি আনা হয়। আনার এক সপ্তাহের মধ্যেই পাখি দুটি ২৪টি ডিম দেয়। এর মধ্যে ৫টি ডিম দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের গবেষণাগারের ইনকিউবেটরে এবং ১টি ডিম নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফুটেছে। আরও কয়েকটি ডিমে তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, উটপাখির খাদ্য ব্যয় তুলনামূলক কম। ঘাস, গাছের পাতা, কলমি শাক, জিরো ফিড ও চুনাপাথর খাওয়ানো হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিম বলেন, দেশে এই প্রথম কোনো মিনি চিড়িয়াখানায় উটপাখির ডিম থেকে সফলভাবে বাচ্চা ফুটেছে। এর আগে দুই-একটি স্থানে বাচ্চা ফুটলেও সেগুলো এক সপ্তাহের বেশি বাঁচেনি। হাবিপ্রবিতে প্রায় ছয় বছর ধরে উটপাখির বংশবৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলার বিষয়ে গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে এটি দেশের প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামে এমন একটি উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে উটপাখির বাচ্চা ফোটানো এই চিড়িয়াখানার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখানে দুম্বা, গাধা, তিন পা-ওয়ালা গরু, বিদেশি কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।
হাবিপ্রবির জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশেদুল ইসলাম জানান, চিড়িয়াখানার উটপাখির দেওয়া ডিম গবেষণাগারের ইনকিউবেটরে ফোটানো হয়েছে। বর্তমানে বাচ্চাগুলো চিড়িয়াখানায় লালন-পালন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি উটপাখির বাচ্চা বিদেশ থেকে আমদানি করতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অথচ দেশেই এখন সফলভাবে উটপাখির বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উটপাখির একটি ডিমের ওজন সাধারণত ১ থেকে ১.৫ কেজি হয়। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিম দেওয়ার মৌসুমে একটি স্ত্রী উটপাখি ৬০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত ডিম দেয় এবং ডিম ফুটতে ৪২ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে।
উটপাখির বাচ্চাগুলোর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা করছেন কৃষিবিদ মোর্শেদা বেগম লুপু। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন তার স্বামী প্রকৌশলী রইচ উদ্দীন মিঞা বাবুল।
চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা রংপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টর আতিক ইমাম সরকার এবং পার্বতীপুর উপজেলার হরিহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খুরশিদ জাহান আলতাফুন নেসা বলেন, সন্তানদের নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছি। আগে উটপাখি দেখেছি, তবে উটপাখির এতগুলো বাচ্চা একসঙ্গে কখনো দেখিনি। এখানকার পরিবেশও খুব সুন্দর।
চিড়িয়াখানার উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মো. রইচ উদ্দীন মিঞা (বাবুল) জানান, ২০২১ সালের মার্চ মাসে আবু তাহের মিঞা এগ্রো ফার্মের আওতায় প্রায় ৩ একর জমিতে প্রথমে তুর্কি দুম্বা ও বিদেশি ছাগলের খামার দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পরে উটপাখি, গাধা, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রাণী সংযোজন করা হয়। বর্তমানে এখানে ৮টি উটপাখি রয়েছে। ভবিষ্যতে বিরল প্রজাতির প্রাণী সংগ্রহের পাশাপাশি উটপাখি, দুম্বা, গাধা ও ময়ূরের বাণিজ্যিক প্রজনন এবং অতিরিক্ত প্রাণী বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।
চিড়িয়াখানায় বর্তমানে চিত্রা হরিণ, ইমু, ময়ূর, তিন পা-ওয়ালা শাহিওয়াল গরু, জার্মান স্পিটজ কুকুর, অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু, চীনা হাঁস, ককাটেল, ব্রাহমা মোরগসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি প্রাণী রয়েছে। শিশুদের বিনোদনের জন্য দোলনা, চরকি, পিকনিক স্পট, ক্যাফে এবং নামাজের ব্যবস্থাও রয়েছে।
দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার, পার্বতীপুর থেকে ১৫ কিলোমিটার এবং ফুলবাড়ী থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মিনি চিড়িয়াখানায় ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি থাকে। নিরাপত্তার জন্য পুরো চিড়িয়াখানা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে।