গল্প

তৃতীয় পুরুষ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

তাতে করে অবশ্য ভালোমন্দ দুইটাই হয়। একদিকে যেমন পুরনো সময়টাকে হাতড়ে খুঁজে বের করা যাবে, যেখানে সেই অপরিণত বয়সের নিরাপত্তাহীনতার বোধ, সংকোচ এবং আত্মপ্রকাশের সুপ্ত ইচ্ছাকে প্রতিনিয়ত লালন করার প্রবৃত্তিকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে আসা হয়, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক মনস্ক সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে আবার পরিচিত লোকালয়ে গিয়ে রহস্যের উদঘাটনও করা হয়।

একদিকে শিকড়ের কাছাকাছি গিয়ে আলেয়ার সেই হাতছানির উৎসের সন্ধান করা, অন্যদিকে নিজ সত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কুসংস্কারকে শক্ত হাতে ডিল করা। যেন সমাজে রহস্য আর বাস্তবতার মধ্যে কোনো ব্যবধান না থাকে।

এসব ভাবতে ভাবতে আশফাক সাহেব সিও অফিস মোড়ে বাস থেকে নামছিলেন। তিনি ফটোজার্নালিস্ট, বিশেষণ পদ যুক্ত একজন সাংবাদিক, যেনবা পরিপূর্ণ সাংবাদিকতাও তার মূল ব্যাপার নয়। এই আধো আধো ব্যাপারটা তার সারা জীবনের সঙ্গী। সেই দিক থেকে আশফাক সাহেবের জীবনসঙ্গিনী রাফিকা রহমান পূর্ণ পদের অধিকারী। তিনি একটা নন প্রফিট অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।

বাস থেকে নেমেই আশফাক সাহেব তার দুঃসম্পর্কের এক চাচাকে দেখতে পেলেন। সেই চাচাও তাকিয়ে দেখছিলেন। তিনি ভাবছিলেন হয়তো চিনে ফেলবেন, চিনলেন না সেই বয়স্ক ব্যক্তি। হয়তো চোখে কম দেখছেন। আশফাক সাহেবের দরকার নির্জনতা। তাই তিনি এড়িয়ে গেলেন।

বলেশ্বর নদীর তীরে পৈতৃক ভিটায় তার বহু বছর আসা হয়নি। নদীর সেই বিশালতা, সেই প্রবাহ এখন আর দেখা যাচ্ছে না। সন্ধ্যা নেমে আসছে। আশফাক সাহেবের মনে পড়ে, এই সর্পিল আকারের নদীর তীর ধরে মাইলের পর মাইল তিনি ছুটে যেতেন। বহু দূর যাওয়ার পর যেই সাদা আলোর ছটা তাকে আকর্ষণ করত, তা নদীর মাঝে থাকা এক ঝোপের ভেতর ঢুকে যেত। সেই ঝোপে অসংখ্য জোনাকি জ্বলজ্বল করতে থাকত। তার কোনো দিন সাহস হয়নি কাছাকাছি গিয়ে দেখার।

অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হয়ে আসছে। আশফাক সাহেব ক্যামেরা বের করেন। আজ আর কোনো অনুসন্ধান নয়, কোনো শ্রমিকের দাবি আদায়ের চিৎকার নয়, রাজপথে পুলিশের বেদম প্রহারে কামিজ ছিঁড়ে পড়ে যেতে থাকা নারীর অসহায়ত্ব নয়—আজ তিনি ক্যামেরার শাটার চাপলেন নিতান্তই এক নৈসর্গিক ছবি তোলার খায়েশে। লং এক্সপোজার দিয়ে বেশ কিছু ছবি তিনি তুললেন। বেশ হালকা লাগছে তার। নিজেকে কোথায় যেন মনে পড়ছে। রাফিকা নেই, এক্সিবিশনের কুশলীরা নেই, কোথাও বিশেষ যাওয়ার নেই আজ তার।

নদীর তীরের পৈতৃক ভিটায় রাত কাটানোর ইচ্ছা তার ছিল না। রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে, সেখানে নতুন কিছু বিল্ডিং গড়ে উঠছে। পুলিশ লাইনসে থাকা তার এক বন্ধুর বাসা আছে সেখানে। সেখানে তার থাকার ব্যবস্থাও করা আছে। আশফাক সাহেব আরও অনেকটা সময় নদীর তীরে বসবেন ভেবে গ্যালারির ছবিগুলো দেখছিলেন। এমন সময় তিনি টের পেলেন যে সদ্য তোলা লং এক্সপোজারের ছবিগুলোতে এমন কিছু ছায়া দেখা যাচ্ছে, যার সঙ্গে আলোর কোনো মিল নেই। এমনকি তার ছোটবেলায় দেখা সাদা আলোর ছটার সঙ্গেও কোনো মিল নেই। একেবারে ফ্রেমের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অদ্ভুত কিছু বিকৃত অবয়ব। তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।

আবার ব্যাগ থেকে ট্রাইপড বের করলেন আশফাক সাহেব। তার চোখমুখের হালকা ভাবটা কেটে গেছে। তার অনুসন্ধানী মোড অনিচ্ছাকৃতভাবেই আবারও অন হয়ে গেছে। ক্যামেরার এক্সপোজার কমিয়ে আনলেন তিনি। সেই একই ফ্রেম আবার ধরলেন। ভাবছেন এটা কি লেন্স ফ্লেয়ার কোনো নাকি ক্যামেরার ঝাঁকুনি?

আশফাক সাহেব জুম ইন করলেন। খুঁজে দেখছেন অবয়বটা একই জায়গায় থাকে কিনা। কিন্তু নতুন ছবিতে অবয়বটা বিলকুল বদলে গেছে। এখন এটা ফ্রেমের আরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। আরও কাছে এসে গেছে তাহলে? তিনি চোখ বন্ধ রাখলেন কয়েক মুহূর্ত।

এবার খালি চোখে নদীর দিকে তাকালেন। কাছে থেকে দূরে, সর্বত্র। কোথাও সেই অবয়ব নেই।

ক্যামেরায় দেখছেন, আছে।

খানিকক্ষণ কিছু একটা ভাবলেন। ছোটবেলায় কখনো কাছাকাছি যাননি। কিন্তু এখন তিনি জানেন, এসব তো কুসংস্কার আর মনের ভয়। আজ ফিরে যাচ্ছেন না।

তিনি বরং ভাবলেন, আজ রাতটা এই পরিত্যক্ত পৈতৃক ভিটাতেই থাকবেন। বন্ধুর বাসায় গিয়ে কাজ নেই।

আশফাক সাহেবের মনে হলো, তিনি একটি ইউনিক সমাজতাত্ত্বিক ঘটনাকে ফ্রেমে তুলে আনছেন। হতে পারে এটি এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া লোকাল গণহিস্টোরিয়া। পারিপার্শ্বিক আবহের কারণে এখন সেটা তার মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষেরও উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছে।

তার এই রূপটা রাফিকা পছন্দ করেন। আশফাক সাহেব সেটা জানেন, তবে সবসময় অনুভব করতে পারেন না। তিনি ভাবেন রাফিকা তাকে সবসময় ভুল বুঝবারই চেষ্টা করে গেল। পৈতৃক ভিটায় ফিরে এসে তার রোমাঞ্চকর অনুভূতি হচ্ছে। মাকড়শার জাল সরিয়ে সরিয়ে দোতলায় ছাদে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। বলেশ্বরের আঁকাবাঁকা চলে যাওয়া দেখতে দেখতে অবচেতনে আবার ফিরে এলো সেই অবয়ব।

কিছু জার্নাল লেখা ছিল ছোটবেলায় আলেয়ার ডাকে ছুটে যাওয়া মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে। অন্যান্য বিষয় খুব বেশি না-থাকলেও মায়ের শরীরের ঘ্রাণ অনেকবারই এসেছে। ভয়ের অনুভূতিগুলোর সঙ্গে এই ঘ্রাণ জড়িয়ে থেকে তাকে রক্ষা করত এই ভারি অনুভূতি থেকে। সেই জার্নালের পাতা বের করেন আশফাক সাহেব। ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে তিনি দেখতে পান, এই লেখাগুলো তো তার লেখা নয়! ভাঙা ভাঙা অক্ষরে তার ব্যাপারেই অন্য কেউ লিখে রেখেছে। এই কথাও লেখা আছে, কীভাবে মায়ের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে একদিন আলেয়ার ডাকে ছুটে গিয়েছিলেন আশফাক সাহেব।

কৌতূহল বাড়ে আরও। তিনি আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন যে আসলেই কি এটা তার হাতের লেখা না? অনেক খুঁজেও কোনো তারিখ খুঁজে পেলেন না তিনি।

কিছু দূর গিয়ে চমকে উঠলেন। রাফিকার কথা লেখা আছে জার্নালে!

‘আশফাক যদিও সাহসিকতার সঙ্গে সেই পিছুটানকে মোকাবিলা করেছে, তবে সে কখনো টের পায়নি এই সাহস তার কোত্থেকে আসে। মায়ের শাড়ি জড়িয়ে আলোর টানে ছুটে যাওয়া আশফাক নিজেকে ভেবেছে প্রলয় ঘটানো সাহসী পুরুষ। আজও সে যখন ভিটায় ফিরে এসেছে, ভাবছে সমাজের গভীর এক রহস্যের ভেদ আজকে সে উন্মোচন করবে। কিন্তু রাফিকার আশ্রয়, তার শরীরের ঘ্রাণ কি সে মুছে আসতে পেরেছে?’

মুহূর্তেই ফ্ল্যাশলাইট বন্ধ করে দেন আশফাক সাহেব।

তার চোখে ধাঁধা লেগে থাকে। সরতে চায় না।

ছবির ফ্রেমে দেখা সেই অবয়ব এবার আরও বিস্তৃত, আরও কাছের হয়ে ফিরে আসে।

আশফাক সাহেব ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে দেন আবারও। কাছের অবয়ব এখন আর অদৃশ্য হয় না। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। আশফাক সাহেব ফ্ল্যাশলাইটের আলোও আর বিশেষ লক্ষ করতে পারছেন না। তিনি হাঁটতে শুরু করেন। মায়ের শাড়ির সেই ঘ্রাণ আরও প্রবল হয়ে বাতাসে ফিরতে থাকে। বৃষ্টির বাতাস বইতে শুরু করে একসময়। আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাফিকার গায়ের ঘ্রাণ, তার জামায় জড়িয়ে থাকা সুবাস, যা বাতাসে মিশতে মিশতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেই কখন কোন গভীর থেকে হুটহাট ভেসে আসে মায়ের চুলের ঘ্রাণও।

তিনি ছুটতে থাকেন আবারও। নদীর পাড়ের গাছের নিচ দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে ছুটে যেতে থাকেন। জোনাকিরা আলো কমিয়ে দিয়েছে। ঝড় বেড়েই চলেছে।

বোধহয় সকাল হওয়ার আগে, আশফাক সাহেব একটা গাছতলায় কাদা মাখামাখি অবস্থায় পড়ে আছেন। বৃষ্টির পানিতে তা এক ছোট জলাভূমির মতো মনে হচ্ছে। তার কেন যেন মনে হয়, এখানকার লোককথা তাকে এমন এক মানসিক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে রহস্য আর বাস্তবতার মধ্যে আর কোনো নিশ্চিত সীমারেখা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি অস্থির হয়ে ক্যামেরার ছবিগুলো দেখতে থাকেন। আশ্চর্য হয়ে তিনি খেয়াল করলেন, প্রত্যেকটা ছবি থার্ড পারসন পারসপেক্টিভ থেকে তোলা। অন্য কেউ তার ছবি তুলেছে এতটা সময়। ছবিগুলোতে তাকেই দেখা যাচ্ছে। আর যে অবয়বের সন্ধানে তিনি ব্যতিব্যস্ত ছিলেন, সেই অবয়ব প্রত্যেকটা ছবিতে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। এমনকি প্রথমে তোলা ছবিগুলোতেও দেখা যাচ্ছে যে তিনি ছবি তুলছেন আর তার চারপাশে সেই বিরাট অবয়ব তাকে ঘিরে আছে।

আশফাক সাহেব টের পেলেন ঘ্রাণটা আর বাতাসে সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকটা জমাট বেঁধে এসেছে। যেমনটা বাস্তবে হয়। খুব কাছাকাছি থাকলে। বোধহয় রাফিকার ঘ্রাণ। তিনি বুঝতে পারছেন না, রাফিকা কাছাকাছি কোথাও এসেছে কি না। তার পুলিশ লাইনসের বন্ধুসহ আরও অনেকগুলো লোকের অবয়ব দেখা যাচ্ছে মনে হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে না এরা কেউ এসেছে কি না। ক্যামেরাটা অন করে ভিউ ফাইন্ডারে দেখতে পেলে নিশ্চিত কিছু একটা বোঝা যেত। রাফিকার ঘ্রাণটা আরও কাছে এগিয়ে আসছে মনে হচ্ছে তার। সেটা যতই এগিয়ে আসছে, আশফাক সাহেবের চেতনাও ততটা নিস্তেজ হয়ে আসছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত