টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাতিয়ার ৮০ গ্রাম, পানিবন্দী ৫০ হাজার মানুষ

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০ এএম

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলাবদ্ধ রয়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি গ্রাম পানিতে ডুবে থাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও অনেক স্থানে এখনো ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনপদ পানির নিচে রয়েছে।

উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, চরকিং, সুখচর, নলচিরা, জাহাজমারা, তমরদ্দি ও চর ঈশ্বর ইউনিয়নের পাশাপাশি হাতিয়া পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় বাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার এবং কাঁচা-পাকা সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বসতঘরের ভেতরেও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, টানা বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় নিচু এলাকার পানি দ্রুত নামতে পারেনি। এতে রান্নাঘর, টয়লেট এবং গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। বহু পরিবার কয়েক দিন ধরে শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করছে। রান্নার চুলা পানির নিচে থাকায় স্বাভাবিকভাবে খাবার প্রস্তুত করাও সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা।

জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি ও মৎস্য খাত। হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজিক্ষেত এবং মাছের ঘের পানিতে ডুবে গেছে। অনেক মাছের ঘের থেকে মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে এবং জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে ভোগান্তি বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। তাদের দাবি, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল-নালা ভরাট এবং টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমাদের চারপাশে কোনো বেড়িবাঁধ নেই। জোয়ার এলেই পানি উঠে যায়। এবার ছয় দিনের টানা বৃষ্টিতে রান্নাঘর ডুবে গেছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। দ্রুত পানি না নামলে আরও বিপদ হবে।’

বুডিরচর ইউনিয়নের কৃষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের-সব শেষ। কয়েক মাসের পরিশ্রম এক বৃষ্টিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে চাষ করার মতো পুঁজিও নেই।’

নলচিরা ইউনিয়নের রিকশাচালক মো. আমির বলেন, ‘রাস্তায় পানি থাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হয় না। সারাদিন রিকশা নিয়ে বসে থাকি। মালিকের ভাড়া তুলতে পারছি না। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’

পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আফ্রিনা বেগম বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে আমাদের এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে। চুলা ডুবে গেছে, রান্না করা যাচ্ছে না। নলকূপও পানির নিচে। বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র। সরকারিভাবে সামান্য কিছু শুকনো খাবার দেওয়া হলেও সবাই তা পায়নি। দ্রুত ত্রাণ না এলে অনেক পরিবার না খেয়ে থাকবে।’

হরনী ইউনিয়নের বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, ‘বাড়ির ভেতর হাঁটুসমান পানি। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। রাতে ভয়ে ঘুম আসে না। এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি আমাদের খোঁজ নিতে আসেননি।’

হাতিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আনিসুর রহমান জানান, উপজেলার প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার প্রস্তুতিও রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল ইকবাল বলেন, হাতিয়া নদীবেষ্টিত উপজেলা হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল। তবে অনেক স্থানে পানি কমতে শুরু করেছে। তিনি জানান, ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।

যদিও বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবুও অনেক এলাকায় এখনো পানি নামেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং কৃষক ও মৎস্যচাষীদের পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত