বৃষ্টি-ঢলে বিপর্যস্ত ৭ জেলা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:১০ এএম

কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে গত দুই দিনের তুলনায় ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি কমে আসায় পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা কমেছে। এদিকে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলাতেও বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও এ সময়ে সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। গতকাল শনিবার বিকেলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে। অতিবৃষ্টির জের ধরে গত কয়েক দিনে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য তিন জেলায় অন্তত ৩০ জন মারা গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী দুই দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এর তীব্রতা কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের চার বন্দরে দেওয়া তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত আজ তুলে নিয়েছে আবহাওয়া অফিস। পাহাড়ধসের সতর্কবার্তাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের দোহাজারী দিয়ে প্রবাহিত সাঙ্গু নদী, হবিগঞ্জে খোয়াই নদী, মৌলভীবাজারে মনু নদী এবং সুনামগঞ্জ ও সিলেটে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং এসব অঞ্চলসংলগ্ন উজানে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কিছু এলাকায় আবার বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে এবং সুরমা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, সিলেট অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে এবং আগামী দুই-তিন পরিস্থিতি একই রকম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতীয় রাজ্যগুলোতে অতিভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি ঢলের পানির কারণে সিলেট, ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীতে পানি বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে নিচু এলাকায় নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে কিছু স্থানে সাময়িক প্লাবিত হতে পারে। আর বৃষ্টি চট্টগ্রামের দিকে কিছুটা কমেছে। তবে ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত হয়তো আরও হবে। তবে এতে খারাপ কিছুর আশঙ্কা নেই।

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসে বলা হয়ে হয়েছে, ‘সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শনিবার দুপুর থেকে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ দিন দেশের আটটি বিভাগের অধিকাংশ জায়গাতেই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

নদ-নদীগুলোর সবশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে বন্যা সতর্কীরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি কমে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় গঙ্গা নদীর পানি বেড়েছে ও পদ্মার পানি এখনো স্থিতিশীল আছে। তবে গঙ্গা-পদ্মার পানি আগামী দুই দিন স্থিতিশীল থাকলেও এরপর বেড়ে যেতে পারে। উত্তরাঞ্চলে তিস্তা, ধরলা করতোয়া, আত্রাই ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়েছে। তিস্তা নদী কয়েকটি পয়েন্টে সতর্কসীমার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর পানিও বাড়তে পারে।

বন্যা পূর্বাভাসকেন্দ্রের তথ্যমতে, ঢাকা সদর ও এর চারপাশের নদী অববাহিকায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও টঙ্গীখাল নদীর পানি বেড়েছে, যা আগামী তিন দিন বাড়বে। পানি বাড়লেও এসব নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হতে পারে।

চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিতে উদ্ধার কাজে সাহায্যের জন্য সরকার ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। এদিকে আরও দুই দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

বান্দরবানে পাঁচ দিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর পানি আবারও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার কিছুটা পানি কমলেও রাতের ভারী বর্ষণে আবার পানি বাড়তে থাকে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। শহরের বালাঘাটা, আর্মিপাড়া, ইসলামপুরে নৌকা চলাচল করতে দেখা গেছে। প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধ ও খাদ্যসংকটে ভুগছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মাঝে নৌকায় করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় সাঙ্গু নদী বান্দরবান শহর পয়েন্টে বিপদসীমার ২ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। অন্যদিকে মাতামুহুরী নদীতে বিপদসীমার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

বান্দরবান বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত দাশ জানান, পাঁচ দিন ধরে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়ক পানিতে ডুবে থাকায় বাস চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বান্দরবানের সঙ্গে ঢাক-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ আছে। এ ছাড়া বন্ধ আছে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ। দুর্গতদের জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে শনিবার পাহাড়ধসে নিহতের পরিবার দুটিকে দেখতে আসেন এমপি সাচিংপ্রু জেরী। এ সময় নিহতের দুই পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেন এবং আজিজনগর ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার রেহেনা আক্তারকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন।

বিলাইছড়িতে ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি : রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী দুর্গম ফারুয়া বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে বাজারের দেড়শ দোকান পুরোপুরি পানিতে নিমজ্জিত। পূর্বে ভারতের মিজোরাম থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে রাইংক্ষ্যং নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাজারটি ডুবে গেছে। এ ছাড়া চাইন্দ্যা, উলুছড়ি, তত্তানালা, একগুজ্জাছড়ি, গোইয়ানছড়ি, শুক্কুরছড়ি ও যমুনাছড়িসহ সবকটি এলাকা এখন সম্পূর্ণ পানির নিচে নিমজ্জিত। রাইংক্ষ্যং নদীতে অতিরিক্ত স্রোত থাকায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে। রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রুহুল আমিন বলেন, ফারুয়াতে ত্রাণ বিতরণের জন্য গত শুক্রবার থেকেই চেষ্টা করছি কিন্তু নদীতে স্রোত বেশি থাকায় সম্ভব হয়নি। বিকল্প ব্যবস্থায় আজ (শনিবার) ফারুয়ার বাজার থেকে ত্রাণসামগ্রী কিনে দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করছি।

এদিকে শনিবার সকাল থেকে জেলার সবচেয়ে বেশি প্লাবিত বাঘাইছড়ির বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে বরকল ও জুরাছড়ির কিছু এলাকার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ। বাঘাইছড়ি ইউএনও আমেনা মাহজানা বলেন, পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড ও ৮টি ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রাম বন্যায় তলিয়ে গেছে। গত দুই দিনে বৃষ্টি না হওয়ায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। এখন ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৯২৮ জন অবস্থান করছেন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিপাতে জেলায় এ পর্যন্ত ১২৫টি স্পটে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া এ সময় গাছ উপড়ে এবং পানিতে ডুবে মারা গেছে তিনজন।

চরফ্যাশনে পানিবন্দি কয়েক হাজার মানুষ : ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এতে পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে কয়েক হাজার মানুষ। বিভিন্ন ইউনিয়নের সøুইসগেট বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে না পেরে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমির শাকসবজি, ১৭০ হেক্টর জমির আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩ হাজার ৬৭১টি ছোট-বড় মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউএনও রুমানা আফরোজ বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

বেনাপোলে আমদানি পণ্য নষ্ট : টানা বর্ষণে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বন্দর এলাকার বিভিন্ন শেডে পানি ঢুকে আমদানিকৃত কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হচ্ছে। জানা গেছে, বন্দরের ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন পাঁচটি শেডে হাঁটুসমান পানি জমে বিভিন্ন ধরনের আমদানিকৃত পণ্য পানিতে তলিয়ে গেছে। আমদানিকারক আল মামুন বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই বেনাপোল বন্দর পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু পরিমাণ, কোথাও কোমরসমান পানি জমে আছে। বন্দরে পানি নিষ্কাশনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয় প্রতি বর্ষায়। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। বেশিরভাগ গার্মেন্টস পণ্যই নষ্ট হচ্ছে।

১০ দিন পর সেন্টমার্টিন ফিরলেন ১৪০ বাসিন্দা : উত্তাল সমুদ্রের কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে গত ১০ দিন ধরে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রলার ও সাধারণ নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফে এসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন সেন্টমার্টিনের দুই শতাধিক বাসিন্দা। আটকেপড়া ১৪০ জন বাসিন্দা ১০ দিন পর তিনটি ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন এসে পৌঁছান। একই সঙ্গে ট্রলারগুলোতে দ্বীপের খাদ্য সংকট নিরসনে জরুরি খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। টেকনাফ ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী জানান, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আটকেপড়াদের দ্রুত ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বীপের মানুষের খাদ্য সংকট নিরসনে প্রায় ৩০০ পরিবারের জন্য চাল, ডালসহ নিত্যপণ্য পাঠানো হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত