প্রতি ডিমে খামারির লোকসান ৪ টাকা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ দশমিক ২০ টাকা থেকে ১০ দশমিক ৫০ টাকা। খুচরা বাজারে ভোক্তারা প্রতিটি ডিম ১০ টাকা বা তারও বেশি দাম দিয়ে কিনলেও খামারিরা বিক্রি করছেন ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতিটি ডিমে লোকসান গুণতে হচ্ছে প্রায় ৪ টাকা। এভাবে উৎপাদন খরচের কমে ডিম বিক্রি করার কারণে প্রতি মাসে খামারিরা ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানে পড়ছেন। বছরের বিভিন্ন সময়ে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতির ফলে গত ৫ বছরে ৬৪ হাজার খামারি তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ)।

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরেন বিপিআইএর নেতারা। এতে মূল বক্তব্য তুলে ধরে সংগঠনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। এর আগে সারা দেশের পোলট্রি খামারিদের রক্ষায় ১১ দফা দাবি নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন খামারিরা। এ সময় তারা সিদ্ধ ডিম বিতরণ করে প্রতিবাদ জানান। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি মেজবাউর রহমান, মহাসচিব এম. সাফির রহমানসহ অন্যরা।

বিপিআইর সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশের হাজার হাজার খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন, ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য পোলট্রি শিল্পকে টেকসই করতে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

পোলট্রি খাতে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন।

বিপিআইএ সভাপতি বলেন, সারা দেশের খামারিদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে প্রকৃত উৎপাদনকারীদের শনাক্ত করা যাবে এবং ঝরে পড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে মাছ, মুরগির বাচ্চা, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। তবে সেই অনুপাতে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পোলট্রি শিল্পের মূল চালিকাশক্তি প্রান্তিক খামারিরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। এই ধারাবাহিকতায় ৫ বছরে ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএর মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, খামারিদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় চলে যায় খাদ্যের পেছনে। তার সঙ্গে খাদ্যের উপকরণ আমদানিতে আছে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর। আমরা এটা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছি।’ প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৃষি খাতের কাঁচামালে এমন কর ব্যবস্থা নেই।

তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাবে পোলট্রি খাতের খামারিরা সুফল পান না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে জাতীয় পোলট্রি বোর্ড গঠন করা হোক। উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে আগামী এক দশকে পোলট্রি খাত সফল শিল্প খাতে পরিণত হবে।

সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে ৬ টাকায় ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনও ভোক্তাকে সাড়ে ১০ টাকায় ডিম কিনতে হয়। ডিম পচনশীল পণ্য হওয়ায় খামারিরা তা মজুদ করতে পারেন না, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত