ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থান টানা ১৫শ দিন নিজেদের দখলে রাখা! এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান ছিল না, এটি ছিল বেলজিয়ামের ফুটবলে এক অভূতপূর্ব আধিপত্যের প্রতীক। থিবো কোর্তোয়া, কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকু, অ্যাক্সেল উইটসেল কিংবা এডেন হ্যাজার্ডের মতো প্রতিভার সমাবেশ ঘটিয়ে বেলজিয়াম ফুটবল এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যাদেরকে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা ভালোবেসে আখ্যা দিয়েছিল ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ বা সোনালি প্রজন্ম। ইউরোপের ছোট এক দেশের জন্য এই তারকাদ্যুতি ছিল এক অভাবনীয় প্রাপ্তি, যাদের পায়ে ভর করে বেলজিয়াম স্বপ্ন দেখেছিল বিশ্বজয়ের। প্রতিটি বিশ্বকাপে তাদের আসা মানেই ছিল নতুন প্রত্যাশার জন্ম, আর এই প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে এবারের আসরের শিরোপা জয়ের স্বপ্নটি ছিল তাদের ক্যারিয়ারের শেষ পূর্ণতা পাওয়ার শেষ সুযোগ।
কিন্তু ফুটবলের নিয়তি তো আর যুক্তির পথে চলে না। লস অ্যাঞ্জেলেসে স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ বাঁশিটি যখন বাজল, তখন বেলজিয়ামের সমর্থকদের হৃদয়ে শুধু একটি হারের বেদনা ছিল না; ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক করুণ সমাপ্তি। এ টুর্নামেন্টটি ছিল মূলত ওই সোনালি প্রজন্মের শেষ বড় আসর। যে স্বপ্ন নিয়ে তারা দীর্ঘ এক যুগ মাঠে লড়াই করেছেন, সেই শিরোপা জয়ের সুযোগটি এই বিশ্বকাপে তাদের শেষবারের মতো হাতছানি দিচ্ছিল। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে ২-১ গোলের সেই হার যেন বেলজিয়াম ফুটবলের এক বর্ণিল অধ্যায়ের যবনিকা টেনে দিল। দীর্ঘ এক যুগ ধরে তারা যে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনেছিলেন, তার পরিসমাপ্তি ঘটল ট্রফিহীন এক বিদায়লগ্নে।
বেলজিয়ামের এ সোনালি প্রজন্মের সদস্যরা ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিশ্ব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময়ে তারা ইউরো ২০১৬, ২০১৮ বিশ্বকাপ, ইউরো ২০২০ এবং কাতার বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চগুলোয় নিজেদের মেলে ধরেছেন। ২০১৮ সালে তৃতীয় স্থান অর্জন ছিল তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ১২ মিলিয়নেরও কম জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য এমন টানা সাফল্য পাওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না। তবুও তাদের ঘিরে প্রত্যাশার পাহাড় গড়ে উঠেছিল। তাদের নিয়ে স্প্যানিশ সাংবাদিক গিলেম বালাগ যেমনটি বলেছিলেন, ‘সোনালি প্রজন্ম হিসেবে গণ্য হতে হলে কিছু সোনা (ট্রফি) জেতা প্রয়োজন। এটিই ছিল প্রত্যাশার মাত্রা।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কাক্সিক্ষত শিরোপা তাদের অধরা রয়ে গেল।
টুর্নামেন্টের এই বিদায়টি ছিল বেদনার্ত। কারণ দলটির গোলরক্ষক কোর্তোয়া এবং ডি ব্রুইনার মতো অভিজ্ঞরা শেষবারের মতো বিশ্বকাপে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন। বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তাই আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা যারা বিদায়ের পথে আছেন, তাদের শেষবারের মতো সাফল্য পাওয়ার সুযোগ ছিল। এটি সত্যিই দুঃখজনক, কারণ সবাই তাদের এই বিশ্ব আসরে অনেক দূর এগিয়ে যেতে দেখতে চেয়েছিল।’ ইনজুরি এবং স্নায়ুর চাপ সব মিলিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের এই ম্যাচটি ছিল বেলজিয়ামের ওই তারকাদের জন্য এক নিষ্ঠুর সমাপ্তি, যেখানে এক অনভিজ্ঞ গোলরক্ষকের ভুল তাদের দাঁড়াল স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে।
তবে সোনালি প্রজন্মের এই বিদায় মানেই বেলজিয়াম ফুটবলের শেষ নয়। দলের বর্তমান স্কোয়াডের বড় একটি অংশ, প্রায় ১৩ খেলোয়াড় ২৫ বছর বা তার কম বয়সী। এই নতুন প্রজন্মও এরই মধ্যে তাদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। চার্লস ডি কেটেলিয়ারে, ইউরি তিলেমানস ও আমাদু ওনানার মতো তরুণরা নতুন ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কোচ গার্সিয়া বলেন, ‘আমাদের তরুণ খেলোয়াড়রা এই হার থেকে শিখবে। আমরা স্পেনের মতো শক্তিশালী দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছি, যা আমাদের মাথা উঁচু করে চলার রসদ জোগায়।’
কোর্তোয়াও টুর্নামেন্টের শুরুতেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এটি বেলজিয়াম ফুটবলের একটি নতুন যুগের সূচনা। তার মতে, পুরনোরা বিদায় নিলেও নতুনদের মধ্যে আছে বড় কিছু করার। ট্রফিহীন এক সোনালি অধ্যায়ের বিদায় বেলজিয়াম ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল একটি অপূর্ণতার গল্প হয়ে থাকবে ঠিকই, তবে নতুন এই প্রজন্মের হাত ধরে এবার রেড ডেভিলরা আশায় থাকল বিশ্বজয়ের।
গ্যালারিতে এদিন যখন দর্শকরা তাদের বীরদের বিদায়ী সংবর্ধনা জানাচ্ছিলেন, তখন এটিই পরিষ্কার ছিল যে, শিরোপা না এলেও বেলজিয়াম ফুটবলের মানদণ্ড তারা এমন এক উচ্চতায় বসিয়ে গেছেন, যা ভবিষ্যতে নতুনদের জন্য চিরকাল প্রেরণা হয়ে থাকবে।