হলি ফ্যামিলিতে অনিয়মের অসুখ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৬ এএম

রাজধানীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। একসময়ে মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল এই হাসপাতাল। তবে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অস্বচ্ছতা, নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটিকে। চিকিৎসাসেবার মান কমে যাওয়ায় রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে অর্থ লোপাট, অনিয়ম ও দুর্নীতি।

হাসপাতালের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রায় ৩২ কোটি টাকার অনুদান ব্যয় করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের দুই উপপরিচালক ডা. সমালেশ চন্দ্র সাহা ও এনামুল হককে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেছে কর্র্তৃপক্ষ। একই অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। এ ছাড়া প্যাথলজি বিভাগের কাঁচামাল বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে কেনা, হাসপাতালের ফার্মেসির অর্থ আত্মসাৎ, অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবে পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো অভিযোগও রয়েছে।

হাসপাতালের প্রধান ফটকে প্রবেশ করলেই একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে হাসপাতালের সংস্কার, উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য দেশের ২২টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। তাদের মধ্যে আছে ব্যাংক এশিয়ার ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা, পূবালী ব্যাংকের ৫ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকের ২ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২ কোটি টাকা, হা-মীম গ্রুপের ২ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, বার্জার পেইন্টের ৭৫ লাখ, জিপিএইচ ইস্পাতের ৫০ লাখ, সাবেক এমপি হাফিজ আহমেদ মজুমদারের ৫০ লাখ, শারমিন গ্রুপের ৪০ লাখ, রাশেদুর রহমানের ৩৮ লাখ, সাবেক এমপি প্রকৌশলী ফজলুল আজিমের ২৮ লাখ টাকা। নাসির চৌধুরী, গ্রিন ডেল্টা ইন্সুরেন্স, পাকিজা গ্রুপ, শহীদ খালেক মেজর সালেক ট্রাস্ট, মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড ২৫ লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি হাফিজ আহমেদ মজুমদারের উদ্যোগে এই অনুদান সংগ্রহ করা হয়।

তবে অনুদানের বিপুল অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি। এই অর্থ ব্যয়ের কমিটিতে ছিলেন হাসপাতালের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সমালেশ চন্দ্র সাহা এবং উপপরিচালক (লজিস্টিক) এনামুল হক। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনুদানের বড় অংশ আত্মসাৎ করেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় প্রায় ১৬ কোটি টাকার গরমিল হওয়ার তথ্য মিলেছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাবেক একজন চেয়ারম্যান এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুদককে চিঠি দেন। তারপরেই অনুসন্ধানে নামে দুদক।

দুদকের পক্ষ থেকে নথিপত্র চেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল থেকে পাঠানো নথিপত্র এখন দুদক কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করছেন। দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, ডা. সমালেশ চন্দ্র সাহাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি ও আর্থিক রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে উপপরিচালক ডা. সমালেশ চন্দ্র সাহা ও এনামুল হক সম্পৃক্ত বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে আরও কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের রেকর্ডপত্রও তলব করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত ১১ জুলাই এবং ১৩ জুলাই বিকেলে ডা. সমালেশ চন্দ্র সাহার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি। তবে সাবেক উপপরিচালক মো. এনামুল হক দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, তিনি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। হাসপাতালে বেশ কয়েকটি কমিটির মধ্যে তিনি একটিতে ছিলেন। ওই কমিটি হাফিজ আহমেদ মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে ৩ লাখ ৫২ হাজার ডলার দিয়ে একটি ৩২ সøাইস সিটিস্ক্যান মেশিন, একটি ৪ডি কালার ডপলার ও একটি মোবাইল এক্সরে মেশিন কিনেছে। সেসব মেশিন এখনো সচল আছে। এগুলো কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। এগুলোর বাইরে অন্য কোনো কেনাকাটা বা অর্থ ব্যয়সংক্রান্ত কমিটিতে ছিলেন না বলেও দাবি করেন এনামুল হক।

এদিকে, হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বায়োটেক কোম্পানি হাসপাতালকে রোগ নির্ণয়ের অত্যাধুনিক প্যাথলজি মেশিন বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে। তবে শর্ত হলো ওই মেশিন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকেই কিনতে হবে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে কাঁচামাল কিনছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, যে কাঁচামাল খোলা বাজারে প্রায় ২ লাখ টাকায় পাওয়া যায়, সেটিই ৫ লাখ টাকা অথবা তারও বেশি দামে কেনা হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসপাতালের ডেপুটি অফিসার (পারচেজ) এসব কাঁচামাল কেনার দায়িত্বে আছেন। আর হাসপাতালের সাবেক এক চেয়ারম্যানের আত্মীয় সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছেন।

হাসপাতালের অভ্যন্তরে পরিচালিত ফার্মেসি নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। দুদকে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, একসময়ে ফার্মেসির দায়িত্বে ছিলেন ডা. সমালেশ চন্দ্র সাহা। তার বিরুদ্ধে ফার্মেসির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে দায়িত্ব পান শফিকুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধেও ফার্মেসির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে দাবি করা হয়, আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি-ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাড়ে ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে কর্মরত আছেন সাড়ে ৬০০ মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রশাসনিক কাজে যুক্ত, বাকিরা চিকিৎসক ও নার্স। জনবল বেশি হওয়ায় অনেক প্রশাসনিক কর্মীর নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব নেই। তারা অলস সময় কাটালেও চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিযোগও রয়েছে।

টিআইবির গবেষণাতেও সুশাসনের ঘাটতি : হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কয়েক বছর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) উদ্বেগ জানায়। ২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করে, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতি, জবাবদিহির অভাব এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা রয়েছে। নিয়োগ, পদোন্নতি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ, আধুনিকায়ন ও আর্থিক পরিকল্পনায়ও বড় ধরনের দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রয়োজনের তুলনায় অদক্ষ ও অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাব হাসপাতালের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে চিকিৎসাসেবার মান কমছে এবং রোগীর আস্থা নষ্ট হচ্ছে। অলাভজনক একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত আর্থিক প্রতিবেদন, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত না হলে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল টিআইবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত