স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার হাইভোল্টেজ বিশ্বকাপ ফাইনালকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন উন্মাদনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ভেসে এলো এক দারুণ খবর। ফুটবল বিশ্বকাপের এই পরম আরাধ্য ফাইনালে চতুর্থ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছেন জর্ডানের আধহাম মাখাদমেহ। আর এশিয়ার এই রেফারির বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোর গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের রেফারিং ইতিহাসের প্রবাদপুরুষ তৈয়েব হাসানের নাম।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় এক রোমাঞ্চকর সংযোগ। আজ থেকে ঠিক ১৩ বছর আগে, ২০১৩ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে বসেছিল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের আসর। তৎকালীন সময়ে প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান রেফারি হিসেবে সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে প্রধান রেফারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের ফিফা এলিট রেফারি তৈয়েব হাসান শামসুজ্জামান। আর সেই ম্যাচে তার অধীনে চতুর্থ রেফারি হিসেবে মাঠের সাইডলাইনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জর্ডানের আজকের বিশ্বকাপ ফাইনালের রেফারি মাখাদমেহ। সাফের মঞ্চে বাংলাদেশের তৈয়েব হাসানের সহকারী হিসেবে কাজ করা সেই তরুণ রেফারিই আজ যোগ্যতা ও দক্ষতার সিঁড়ি বেয়ে পা রাখলেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের ফাইনালে।
সাবেক সহকর্মীর এই অনন্য অর্জনে উচ্ছ্বসিত তৈয়েব হাসান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আধহাম মাখাদমেহের এই সাফল্য এশিয়ার রেফারিংয়ের জন্য এক বিশাল গৌরবের। খবরটি শোনার পর থেকেই আমার ২০১৩ সালের সাফ ফাইনালের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। তখন ও খুব তরুণ ছিল, কিন্তু ওর মনোযোগ আর শেখার আগ্রহ ছিল দেখার মতো। আমার অধীনে ও সেদিন চতুর্থ রেফারি হিসেবে কাজ করেছিল, আর আজ ও নিজেই বিশ্বকাপের মতো বিশ্বসেরা মঞ্চের ফাইনালে দাঁড়িয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করবে-একজন অগ্রজ এবং সাবেক সহকর্মী হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি, আধহামের এই উত্থান আমাদের এই অঞ্চলের তরুণ রেফারিদের মনে আত্মবিশ্বাস জোগাবে, যে সঠিক পরিশ্রম আর সততা থাকলে সাফের আঙিনা থেকে উঠে এসেও একদিন বিশ্বকাপের ফাইনালে রাজত্ব করা সম্ভব।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলো ছড়ানো এই কিংবদন্তি রেফারি তৈয়ব হাসান পেশায় একজন শিক্ষক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনামের সঙ্গে ম্যাচ পরিচালনা করলেও শেকড়ের টানে নিজের জেলা সাতক্ষীরাতেই তার বেশিরভাগ সময় কাটতে হয়।
যদিও এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার কোনো রেফারি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত আসরে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পাননি, তবে তৈয়েব হাসান বিশ্বমানের রেফারিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এশিয়ান স্তরের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশের রেফারিং জগতে তৈয়েব হাসান এক অনন্য মাইলফলক। দেশের ইতিহাসে তিনিই সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করার গৌরব অর্জন করেছেন। এছাড়াও দীর্ঘ ১৮ বছর ফিফা রেফারি এবং ১০ বছর এএফসি এলিট প্যানেলে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
মাঠে নিখুঁত রেফারিং এবং মাঠের বাইরে অনন্য জনহিতকর কর্মকাণ্ডের জন্য তৈয়েব হাসান স্বয়ং ফিফা ও এএফসি প্রেসিডেন্টদের কাছ থেকে প্রশংসা ও সম্মান লাভ করেছেন। এশিয়ান ফুটবলে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে তাকে মর্যাদাপূর্ণ এএফসি মোমেন্টো রেফারিজেস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। দেশের মুখ উজ্জ্বল করা এই কৃতি রেফারিকে রাষ্ট্রও দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান। ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। এছাড়াও বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেও তিনি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।
স্পেন-আর্জেন্টিনার ফাইনালে যখনই চতুর্থ রেফারি মাখাদমেহকে দেখা যাবে, তখনই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করবেন তৈয়েব হাসানকে। মাখাদমেহর এই বিশ্বমঞ্চের যাত্রা প্রমাণ করে, তৈয়েব হাসানের দেখানো পথ ধরেই এশিয়ার রেফারিং আজ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।