রাধিকা (ছদ্মনাম), যার বয়স আনুমানিক ৩২ বছর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে গোছানো সুখের সংসার তার। সন্তানের জীবন রাঙাতে দেশ ছাড়েন তার স্বামী। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে অবস্থান করছেন তিনি। এরই মধ্যে গ্রামের এক দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে রাধিকার পরিবার। তাদের (দালালচক্রের) চোখে ইতালির উন্নত ও রঙিন জীবনের স্বপ্ন দেখে স্বামী-স্ত্রী হারিয়েছে সব। ফাঁদে পড়ে ভুক্তভোগী রাধিকা হারিয়েছেন স্বামী-সন্তান। তবে পেয়েছেন লিবিয়া গেমঘরের (অবৈধভাবে ইতালি নেওয়ার সময় লিবিয়াতে যেখানে রাখা হয়) এক ফুটফুটে শিশুকে। সেই সন্তানের বাবার পরিচয় নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন রাধিকা। শুধু তিনিই নন, তার মতো এমন আরও তিন তরুণীর গল্পও গা শিউরে ওঠার মতো।
মানব পাচার নিয়ে কাজ করা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, উচ্চাভিলাষী জীবনের মোহে পড়ে পুরুষদের পাশাপাশি এখন নারীরাও চোরাগলিতে পড়ছে। বাংলাদেশ থেকে একটি চক্রের মাধ্যেমে পুরুষের পাশাপাশি এখন নারীরাও ইতালি যাওয়ার জন্য গেমঘরে যাচ্ছে। তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত একজন নারীও সফলভাবে ইতালিতে পৌঁছাতে পারেননি। লিবিয়ার গেমঘর থেকেই সিআইডি কর্মকর্তাদের খোঁজ পান এই নারী। সেই সূত্র ধরেই আসেন রাজধানীর মালিবাগ সিআইডি সদরদপ্তরে। সেখানে শোনান ইতালি যাওয়ার পথে পথে জীবনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা।
টাঙ্গাইলের রাধিকা ও তার প্রবাসী স্বামীকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেন দালালচক্রের সদস্য স্থানীয় সুমন ও সাগর। তারা জানায়, বাংলাদেশ থেকে তাকে নেওয়ার পর পথে তার স্বামীকেও সঙ্গে নেওয়া হবে জানানো হয়। তারপর দুজনকে একসঙ্গে ইতালিতে গেম দেওয়া হবে। মিষ্টি কথায় ঘরছাড়া করার পর বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। চক্রের সদস্যদের কথা মতো, তাদের কাছে পাসপোর্ট দেন এই নারী। স্বামী-স্ত্রীকে একসঙ্গে গেম দিতে চুক্তি হয় ৩২ লাখ টাকায়। পরে বিশেষ ছাড়ে ৩০ লাখ টাকা করে চক্রটি।
ভুক্তভোগী রাধিকার ভাষ্য মতে, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে তাকে দুবাই ভিসায় ঘরছাড়া করে চক্রটি। দুবাই পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে বের না করায় পরিবারের লোকজন যোগাযোগ শুরু করে দালালদের সঙ্গে। তারা জানায়, তাকে কোথাও যাওয়া লাগবে না, এখনই ইতালিতে ফ্লাইট করে দেওয়া হবে। তারা বলে, ভালো সুযোগ আসছে আজকে আপনাকে এই ফ্লাইটে ইতালিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর আপনার স্বামীকে পরের ফ্লাইটে নেওয়া হবে। এ খবর শোনার পর বাড়ি থেকে স্বজনরা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তারা জানায় কোনো সমস্যা নেই। তাকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে। ওই সময় দুবাই থাকা অবস্থায় পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে বিকাশ ও ব্যাংক হিসাব নম্বরে ১৫ লাখ টাকা নেয় সুমন ও সাগর। বাকি টাকা ও তার স্বামীকে ইতালিতে নেওয়া হবে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাধিকা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চক্রটি ইতালি ফ্লাই করার কথা বলে মিসরে নেয়। বিমান থেকে নামার পর আমার গলা শুকিয়ে যায়। সেখানে রাস্তার ওপর সবাইকে বসিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে নেয় তারা। ওই সময় বাংলাদেশ এবং দুবাই থেকে দেড় শতাধিক লোককে একসঙ্গে মিসরে নেয় চক্রটি। এই দলে চারজন নারীও ছিলেন। তাদের মধ্যে এক হতভাগা আমি। মিসর বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শেষ করার পর বের হয়ে দালাল সুমন ও সাগরকে ফোন করে কোথায় নিয়ে এলেন, জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘ওই দিকে সমস্যা থাকায় সরাসরি ফ্লাইট করাতে পারিনি, এই দিক দিয়ে যেতে হবে। এখানে ফ্যামিলি বোটে দিয়ে দেওয়া হবে, কোনো সমস্যা হবে না। এখন মিসর থেকে লিবিয়ার বেনগাজি চলে আসেন। সেখানে আমার লোক আছে, যে আপনাকে রিসিভ (গ্রহণ) করবে।’
পরে তারা সবাইকে আবার মিসর থেকে ইমিগ্রেশন করিয়ে বিমানযোগে লিবিয়ার বেনগাজিতে নেয়। সেখান থেকে সবাইকে দলে দলে বিভিন্ন গাড়িতে ভাগ করে তুলে দেওয়া হয়। রাধিকা বলেন, ‘আর আমাকে এক লিবিয়ান গাড়িতে করে বিমানবন্দর থেকে নেয়। আর বাকি তিন মেয়েকে অন্য তিনটি গাড়িতে পুরুষদের সঙ্গে দেওয়া হয়। দুই দিন গাড়িতেই ছিলাম। তারপর ত্রিপলিতে পৌঁছাই। পৌঁছানোর পর সুমন-সাগর চক্র আমাকে বিক্রমপুরের লৌহজং থানার সাইফুল (পাসপোর্টে নাম টুটুল) নামের আরেকজনের কাছে পাঠিয়ে দেয়।’
রাধিকা বলেন, ‘এরপর নতুন ফাঁদে পড়ি আমি। তারা দুজন বলে আপা, সবাইকে যেখানে রাখা হয়েছে, সেখানে আপনাকে রাখা যাবে না। ওখানে অন্যরা আপনাকে বিরক্ত করবে। আপনি এলাকার মানুষ, ওখানে রাখা ঠিক হবে না। গেম দেওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের বড় ভাই টুটুলের বাসায় থাকবেন আপনি। সেখানে আপনার কোনো সমস্যা হবে না। ওই টুটুল লিবিয়ানের কাছ থেকে আমাকে নিয়ে যায়। তারপর একটি প্রচীরঘেরা বাড়ির একটি কক্ষে আটকে রাখে। সেখানে দিনের পর দিন চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সেখানেই আটক রাখা হয় দীর্ঘ সাত মাস। আটকে রাখে অবস্থায় আমার গর্ভে সন্তান চলে আসে। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে ছয় মাসের বাচ্চা পেটে থাকা অবস্থায় গেমঘরে পাঠিয়ে দেয় ঘাতক টুটুল, সাগর ও সুমন। সেখান থেকে এক লিবিয়ানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে ওই লিবিয়ান পেটে সন্তান থাকায় খারাপ ব্যবহার করেনি। নিয়মিত খাবার দিয়েছে। তার কাছে আরও অনেক মানুষ বন্দি ছিল, তাদের খাবার পর্যন্ত দেওয়া হতো না। আমাকে দেওয়া খাবার নিজে একটু খেতাম, বাকিটা সবার মধ্যে ভাগ করে দিতাম। ওই গেমঘরে রাখা হয় আরও তিন মাস।’
ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘দালালচক্রের সদস্যরা ইতালিতে নেওয়ার জন্য নারীদের গেমঘরে নেন না, হেনস্তা করার জন্য নিয়েছে। সেখানে বন্দি করে আর বাড়তি টাকা চাওয়া হয়নি। গেমঘরেও কিছুদিন আমার সঙ্গে ছিল টুটুল। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর লিবিয়ানের বাসায় নিয়ে রাখা হয়। সেখানে গিয়েও তিন বাংলাদেশি নারীসহ নয় জনকে পাই। তাদের শারীরিক নির্যাতন করা হতো। পরে তাদেরও দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’
গেমঘর থেকে ছাড়া পাওয়ার বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে তারা আমার সঙ্গে আর কিছুই করতে পারছে না। এর মধ্যে একদিন রাতে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ি। ওইদিন রাত চারটার দিকে টুটুলের সঙ্গে আমাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পাসপোর্টে আউটপাস লাগিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেশে আসার পরও পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর শেষবার স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছে। এরপর আর যোগাযোগ নেই। নয় মাস স্বামী ও পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। মা ও বোনসহ চাচা-চাচি দেশে আসার বিষয়টি জানেন। এ ছাড়া আর কেউ জানেন না। দেশে আসার পর স্বামীর সঙ্গে কয়েক বার কথা হলেও তিনি আর সংসারে ফেরত নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।’
লিবিয়ায় টুটুল নামে যেই ব্যক্তির দ্বারা তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওই নারী বলেন, তিনি দেশ ফেরার পর টুটুল একবার দেশে আসেন। তবে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। ভুক্তভোগী নারী কোনো মামলা করতে চান না। এ বিষয়ে মানব পাচার চক্রের সদস্য সাগর ও সুমনের নামে থাকা মানব পাচার মামলায় তাকে সাক্ষী করার কথা জানায় সিআইডি।