নবীজির কাছে আমাদের ঋণ আছে

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ এএম

মানুষের নানা ধরনের ঋণ থাকে। মায়ের ঋণ। বাবার ঋণ। শিক্ষক, সমাজ ও দেশের ঋণ। এমন ঋণও আছে, যা অনেক সময় আমাদের ভাবনার আড়ালে থেকে যায়। যেমন নবীজির ঋণ। তিনি পৃথিবীর জন্য রহমতস্বরূপ। তার চেয়ে বড় উপকারকারী মানুষ আর কেউ নেই। তিনি না এলে আমরা কোরআনের হেদায়েত পেতাম না। ইমানের স্বাদ পেতাম না। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য জানতে পারতাম না। আল্লাহকে চেনার পথও আমাদের সামনে উন্মুক্ত হতো না। তিনিই পরকালে আমাদের জন্য জান্নাতের সুপারিশ করবেন। তার কাছে আমাদের যে ঋণ, তা কখনো শোধ হওয়ার নয়। আমরা কেবল সেই ঋণের কথা স্মরণ করতে পারি। তার জীবনকে জানার চেষ্টা করতে পারি। তার আদর্শ অনুসরণ করতে পারি। তার প্রতি দরুদ পাঠ করতে পারি।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের শেষ স্বপ্নও ছিল এই ঋণকে কেন্দ্র করেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি অনুভব করেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষকে নিয়ে কিছু লেখা দরকার, যার জীবন যুগে যুগে কোটি কোটি মানুষকে পথ দেখিয়েছে।

ঘটনার শুরু ছিল খুবই সাধারণ। তিনি একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নতুন বিক্রয়কেন্দ্র উদ্বোধন করতে যান। সেখানে একজন আলেম অত্যন্ত আবেগীয় দোয়া করেন। দোয়ার ভাষা, গভীরতা ও আন্তরিকতা হুমায়ূন আহমেদকে প্রচণ্ডভাবে স্পর্শ করে। অনুষ্ঠান শেষে তিনি সেই আলেমের সঙ্গে কথা বলেন। তখন আলেম নিজের বহুদিনের একটি ইচ্ছার কথা জানান। তিনি হুমায়ূন আহমেদকে বলেন, আপনার লেখা অসংখ্য মানুষ পড়ে। আপনি যদি নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী লেখেন, তাহলে অনেক মানুষ তার জীবন সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারবে।

এই কথাগুলো হুমায়ূন আহমেদের অন্তরে দাগ কাটে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নবীজি (সা.)-এর জীবন নিয়ে লিখবেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারেন, এটি অন্য যেকোনো উপন্যাস বা গল্পের মতো সহজ কোনো কাজ নয়। এখানে সামান্য ভুলও বড় ভুল। কারণ বিষয়টি কোনো সাধারণ মানুষের নয়। মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসুলের জীবন নিয়ে লেখা।

সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি দীর্ঘ প্রস্তুতি শুরু করেন। সিরাতের অসংখ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করেন। বিশেষভাবে সংগ্রহ করেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)-এর রচিত সিরাতবিষয়ক বইগুলো। তিনি নিয়মিত তার সঙ্গে আলোচনা করতেন। কোথাও কোনো তথ্যগত ত্রুটি যেন না থাকে, সেই বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক।

বইটির নামও ঠিক হয়ে যায়। ‘নবীজি’। প্রচ্ছদও তৈরি হয়। লেখাও শুরু করেন। কয়েক পৃষ্ঠা হয়ে যায়। কিন্তু তারপর হঠাৎ থেমে যান। কারণটি ছিল বিস্ময়কর। তিনি শুনেছিলেন, অনেক সৌভাগ্যবান মানুষ স্বপ্নে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছেন। তার মনেও প্রবল আকাক্সক্ষা জন্ম নেয়। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, যেদিন নবীজিকে স্বপ্নে দেখবেন, সেদিন থেকেই আবার লেখা শুরু করবেন। অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে ছেলেমানুষি বলেন। তিনি নিজেও সেটি স্বীকার করেছিলেন। তবু সেই আকাক্সক্ষা থেকে তিনি সরে আসেননি।

এরপর আবার তিনি ছুটে যান মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)-এর কাছে। সেখানে তিনি পান ‘স্বপ্নযোগে রাসুল সা.’ গ্রন্থটি। বইটি তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তিনি বারবার পড়েন। এ সময়ই তার শরীরে ধরা পড়ে মরণব্যাধি ক্যানসার। চিকিৎসার জন্য যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রে।

বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি স্ত্রীকে তিনটি জিনিস আলাদা করে রাখতে বলেন। একটি জায়নামাজ। একটি তাসবিহ। আর মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)-এর লেখা ‘স্বপ্নযোগে রাসুল সা.’ গ্রন্থ। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই তিনটি জিনিসই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী।

নিউ ইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। দীর্ঘ সময় জায়নামাজে বসে থাকতেন। দোয়া করতেন। ধ্যান করতেন। কাছের মানুষদের কাছে বলতেন, তিনি একটি বিশেষ বিষয়ের অপেক্ষায় আছেন। সেই অপেক্ষা শেষ হলেই তিনি আবার লিখবেন।

এক রাতে হুমায়ূন আহমেদ ঘুম থেকে উঠে অজু করে নামাজ পড়েন। তারপর গোসল করে লিখতে বসেন। সেই রাতে কি ঘটেছিল, কি লিখেছিলেন, সেই বিষয়ে তার স্ত্রী গণমাধ্যমে বলেনÑ হুমায়ূন আহমেদ ‘নবীজি’ গ্রন্থ কিছুটা লেখার পর নবীজিকে স্বপ্নে দেখার ইচ্ছায় লেখা বন্ধ করে দেন। আমেরিকায় চিকিৎসাধীন এক রাতে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ‘নবীজি’ গ্রন্থ লেখা ফের শুরু করেন। এটি লেখা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এটাই হুমায়ূন সাহিত্যের শেষ কাজ। হুমায়ূন নবীজিকে সেই রাতে সম্ভবত স্বপ্নযোগে দেখেছিলেন। না হয় ‘নবীজি’ গ্রন্থ ফের শুরু করার কথা নয়। কিন্তু রহস্যমানব নবীজিকে স্বপ্নে দেখেছেন কিনা, তা কাউকে বলে যাননি।

এই অসম্পূর্ণ গ্রন্থে তিনি অসাধারণ গদ্যশৈলীর পরিচয় রেখে যান। একদম ঝরঝরে শব্দ তিনি বেছে নেন। তার ছোট ছোট বাক্যের ভেতর দিয়ে যেন আরবের পুরনো ইতিহাস নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করছিল।

হুমায়ূন তার লেখার শুরুতেই আরবের জাহেলি সমাজের নির্মম চিত্র তুলে ধরেন। ধু ধু মরুভূমি। পানির অভাব। গোত্রে গোত্রে সংঘাত। দুর্বল মানুষের ওপর অত্যাচার। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথা। এমন এক সমাজ, যেখানে মানবতার আলো প্রায় নিভে গিয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই তিনি স্মরণ করেন পবিত্র কোরআনের সুরা তাকবিরের সেই আয়াতগুলো, যেখানে কেয়ামতের দিন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? (সুরা তাকবির ৮-৯)

এমন অন্ধকার সমাজেই জন্ম নিয়েছিলেন সেই মহামানব, যিনি পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছেন। মানুষের চিন্তা, সমাজ ও সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছেন।

গ্রন্থের ভূমিকায় হুমায়ূন আহমেদ একটি অসাধারণ স্বীকারোক্তি দেন। তিনি লেখেন, ‘যে মহামানব করুণাময়ের বাণী আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন, আমি এক অকৃতী তার জীবনী আপনাদের জন্য লেখার বাসনা করেছি। সব মানুষের পিতৃঋণ-মাতৃঋণ থাকে। নবীজির কাছেও আমাদের ঋণ আছে। সেই বিপুল ঋণ শোধের অতি অক্ষম চেষ্টা। ভুলভ্রান্তি যদি কিছু করে ফেলি তার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি পরম করুণাময়ের কাছে। তিনি তো ক্ষমা করার জন্যই আছেন। ক্ষমা প্রার্থনা করছি নবীজির কাছেও। তার কাছেও আছে ক্ষমার অথৈ সাগর।’

এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে একজন মানুষের আত্মসমর্পণ। একজন লেখকের বিনয়। একজন সত্যসন্ধানীর ভাষা। তিনি নবীজির প্রতি যে ভালোবাসা পোষণ করেছেন, মহান আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং নবীজির সুরারিশ নসিব করুন।

আসলে নবীজির ঋণ কোনোভাবেই শোধ করা সম্ভব নয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন মানুষকে ভালোবাসতে। শিখিয়েছেন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে। এতিমের পাশে দাঁড়াতে। নারীর সম্মান রক্ষা করতে। প্রতিবেশীর হক আদায় করতে। ক্ষমা করতে। ধৈর্য ধরতে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে। তিনি না এলে আমরা ইসলামের আলো পেতাম না। কোরআনের বাণী আমাদের কাছে পৌঁছাত না। জান্নাতের পথও আমাদের অজানাই থেকে যেত।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তার আয়াত তেলাওয়াত করেন, তাদের পবিত্র করেন এবং তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন। যদিও এর আগে তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় ছিল।’ (সুরা আলে ইমরান ১৬৪)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব ২১)

এই আদর্শই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদের বিনিময়ে আমরা যাই করি না কেন, নবীজির ঋণ শোধ হবে না। তবে তার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা, তার সুন্নাহ অনুসরণ এবং তার শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে সেই ঋণ স্বীকারের ক্ষুদ্রতম প্রকাশ।

হুমায়ূন আহমেদ বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এবং যে অনুভূতির কথা বলে গেছেন, তা আজও আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তার সেই বিনয়ী স্বীকারোক্তি ভাবতে শেখায়, আমরা কি সত্যিই নবীজির প্রতি আমাদের ভালোবাসার দাবি পূরণ করতে পেরেছি? সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত