পাটের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে সরকার

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৮ এএম

বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ‘রোডম্যাপ’ করেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কর্মসূচিও ঠিক করেছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক সাক্ষাৎকারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও নতুন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম।

প্রশ্ন : ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে ১৫৫ দিন পার হয়েছে। এ সময়ে মন্ত্রণালয়ের গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি কতটুকু? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার কী ছিল?

উত্তর : প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের অগ্রাধিকার ছিল বিজেএমসি ও বিটিএমসির অধীন বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালু করা। যেগুলো বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারা মিল বন্ধ করে লুটপাট করে খেয়ে গেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে হবে। ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি শিল্পগোষ্ঠী, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রশ্ন : প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বন্ধ মিল-কারখানা চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত অগ্রগতি কতটুকু?

উত্তর : বিজেএমসির প্রায় ২৫টি ও বিটিএমসিরও প্রায় ২৫টি মিল রয়েছে। সব মিলই বন্ধ ছিল। ইতিমধ্যে ১৪টির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯টি মিলে উৎপাদন শুরু হয়েছে। আরও তিনটির সঙ্গেও চলতি মাসেই চুক্তি সম্পন্ন হবে। অনেক মিলের বিষয়ে মামলাজনিত সমস্যা আছে। এগুলোও ঠিক হয়ে যাবে। কিছু প্রকল্প টেন্ডার পর্যায়ে রয়েছে, আবার কিছু প্রকল্প উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

প্রশ্ন : বন্ধ এসব মিল চালুর ফলে কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হলো?

উত্তর : এখন পর্যন্ত বিজেএমসির মিলগুলোতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার ও বিটিএমসির মিলগুলোতে প্রায় ৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যেই বিজেএমসির আরও চারটি এবং বিটিএমসির আরও তিনটি মিল বেসরকারি বিনিয়োগের আওতায় যাবে। চুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড দিই। কারণ পুরনো ভবন সংস্কার, নতুন কারখানা নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি ও স্থাপনে সময় লাগে। আগামী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে আরও সাত-আটটি মিলের চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী।

প্রশ্ন : সব বন্ধ মিল চালু হলে কত মানুষের কর্মসংস্থান হবে?

উত্তর : সব মিল চালু করা সম্ভব হলে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

প্রশ্ন : পাটশিল্প একসময় বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানি পণ্য ছিল, যা সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যায়। এর পুনর্জাগরণে পরিকল্পনা কী?

উত্তর : পাটকে একসময় ‘সোনালি আঁশ’ বলা হতো। হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। বিশেষ করে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া, পাট বীজের সংকট দূর করা। এ ছাড়া গবেষণার মাধ্যমে এমন জাত উদ্ভাবনের কাজ চলছে, যা জাগ দিলে বিদেশি বীজ থেকে উৎপন্ন পাটের মতোই ১০০ দিনের মধ্যে পচন হবে। বিজেআরআই তোষা-৯ নামে একটি নতুন জাত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

প্রশ্ন : প্লাস্টিক পণ্য পরিহার করে পাটজাত পণ্যের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

উত্তর : পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। সরকারি অফিসে পাটজাত পণ্য ব্যবহারে উদ্ধুদ্ধ করছি। আমরা চাই, ব্যাংকগুলোতেও টাকা বহনের জন্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ব্যবহার হোক। শপিংমল, সুপারশপ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাটজাত ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

প্রশ্ন :আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে পাটজাত পণ্যের প্রচারে কি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

উত্তর : দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পাটাজাত পণ্য প্রদর্শনের জন্য স্পেস দিতে প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের দূতাবাসগুলোতেও এ রকম একটা কর্নার করা যায় কিনা তা নিয়ে আলাপ হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল জুট এক্সপো করব।

প্রশ্ন : সরকার শিক্ষার্থীদের মাঝে জুটের ব্যাগ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সম্পর্কে জানতে চাই।

উত্তর : প্রাইমারি শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ দিচ্ছি, এটি প্রধানমন্ত্রীর একটা কমিটমেন্ট। এ ক্ষেত্রেও জুটন ব্যাগগুলো দেওয়ার চেষ্টা করছি। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ ব্যাগ দেব। এতে শিশুদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের সচেতনতা তৈরি হবে। এ বিষয়ে কৃষকদের এনকারেজ করলে পাটের উৎপাদন বাড়বে। সোনালি আঁশের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে মানুষ পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হবে।

প্রশ্ন : কৃষকরা পাট চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে সরকারের পদক্ষেপ কি?

উত্তর : কৃষকরা বিমুখ হওয়ার কারণ, অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হয়। তবে পাটের মূল্য গত বছর থেকে ফিরে আসছে, ৫ হাজার টাকা মণ হয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকা। এ কারণেই সরকার খাল খনন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন : বস্ত্রশিল্পে পাটের ব্যবহার বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

উত্তর : বর্তমানে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ১৩৫ দেশে পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। জারা, এইচঅ্যান্ডএম, আইকিয়া, ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্কসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডে বাংলাদেশি পাটজাত পণ্য যাচ্ছে। কটনের সঙ্গে পাট মিশিয়ে নতুন ধরনের ফেব্রিকও তৈরি হচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনা করে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে পাটের ব্যবহার আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন : সরকারের যাত্রা শুরু হওয়ার পর কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি মনে হয়েছে?

উত্তর : দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, মামলাজট, জনবল সংকট এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আইন ও নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এসব সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। তাই সমাধানেও সময় লাগবে। আগামী এক বছরের মধ্যেই মানুষ এর ইতিবাচক ফল দেখতে পাবে।

প্রশ্ন : আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কি উন্নয়নকাজে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

উত্তর : নেতৃত্ব ঠিক থাকলে আমলাতন্ত্র বড় বাধা নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

প্রশ্ন : সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কি কি ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

উত্তর : ফরিদপুর থেকে পাটচাষিদের নিয়ে উঠানবৈঠক শুরু করছি। এরপর তাঁতশিল্প, নকশিকাঁথাসহ অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের কাছেও যাচ্ছি। যারা উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাদের সমস্যার কথা শুনে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণই আমাদের লক্ষ্য। আগামী বছরে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ লাখ ৮০ হাজার টন থেকে সাড়ে ১৫ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশের পাট, তাঁত ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে নতুন করে পুনর্জাগরণের পথে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত