দক্ষতার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদ

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে সরকার। সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়েছে। এতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে যোগ্যতা যাচাই আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে এমডি ও সিইও পদে প্রার্থীর অভিজ্ঞতা, বয়স, আর্থিক স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপি না হওয়া, কর পরিশোধ এবং দুর্নীতি বা আর্থিক অপরাধে জড়িত না থাকার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা আগের নীতিমালা রহিত করা হয়েছে। তবে আগের নীতিমালার অধীনে সম্পন্ন কোনো কার্যক্রম নতুন নীতিমালার অধীনে সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে মনোনয়নের জন্য প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায় প্রশাসনে উচ্চতর শিক্ষা ও পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষা জীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। পাশাপাশি শিক্ষাগত ফলাফলের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানদ- পূরণ করতে হবে।

নতুন নীতিমালায় এমডি ও সিইও পদে প্রার্থীর ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় কর্মকর্তা হিসেবে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এমডি, সিইও অথবা ওই পদের অব্যবহিত আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রার্থীকেও নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা যাবে। প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ৪৫ বছর হতে হবে। তবে ৬৫ বছর বয়স অতিক্রম করার পর এমডি ও সিইও পদে থাকা যাবে না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ হবে ৩ বছর। প্রয়োজনে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।

শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর আইটি নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (এএমএল, সিএফটি) বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অন্য কোনো ব্যবসা বা পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থও রাখা যাবে না।

এ ছাড়া ঋণখেলাপি, করখেলাপি বা আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে এমডি ও সিইও পদে নিয়োগের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। আর্থিক অনিয়ম, প্রতারণা, জালিয়াতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত লঙ্ঘন বা অন্য কোনো আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিও এ পদে বিবেচিত হবেন না। কোনো সময় আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হওয়া কিংবা দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি বা নৈতিক স্খলনের কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়াও অযোগ্যতার কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ডিএমডি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১৫, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরিকালে ১৫, ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষায় ৫, চাকরির রেকর্ডে ১০, বিগত ৫ বছরের এসিআরে ৪০ এবং সাক্ষাৎকারে ১৫ নম্বর রাখা হয়েছে। ফলে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, প্রার্থীর কর্মদক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড ও সাম্প্রতিক কর্মমূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

নতুন নীতিমালায় শীর্ষ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রার্থীর বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, ফৌজদারি মামলা, দুদকের মামলা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গুরুতর অনিয়ম-সংক্রান্ত বিষয় বিচারাধীন থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রয়োজনবোধে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন বা আন্তঃবদলি স্থগিত রাখতে পারবে।

বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত এড়াতেও বিধান রাখা হয়েছে। বাছাই কমিটির কোনো সদস্যের সঙ্গে প্রার্থীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ স্বার্থের সংঘাত থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মূল্যায়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওই সদস্য অংশ নিতে পারবেন না।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি-সিইও পদে মনোনয়ন এবং বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে পদোন্নতির জন্য সাত সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি থাকবে অর্থমন্ত্রী। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক অনুবিভাগ) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, নতুন নীতিমালায় মূল কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে বাছাই কমিটির গঠন ও কার্যক্রমের বিষয়টি এবার আরও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগের নীতিমালার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারের এ উদ্যোগ ইতিবাচক হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মো. মোতাহার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির নিয়োগ সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন নীতিমালায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও এমডি পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির সুযোগ রাখায় ব্যাংকিং অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে বহু দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডিএমডি রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে মেধা, দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এমডি নিয়োগ করা হলে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে উৎসাহ বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগের সুযোগ অস্বচ্ছতা, প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও আস্থার সংকটে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নেতৃত্ব নির্বাচনে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগের বিধান পুনর্বিবেচনা করে কঠোর ও স্বচ্ছ মানদ- নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ এমডি নিয়োগ কোনো ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করার বিষয় নয়; এটি আমানতকারী, ব্যাংকিং খাত ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত