বাংলা কিউআর নিরাপদ ও মানসম্মত পেমেন্ট ব্যবস্থা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম

বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে ‘বাংলা কিউআর’। দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য কাঠামোর আওতায় আনতে গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআর ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর লক্ষ্য, দেশের প্রতিটি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একটি অভিন্ন কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা, যাতে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) হিসাব ব্যবহার করে সহজেই অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলতাফ হুসাইন। ২০ বছরেরও বেশি সময়ের পেশাজীবনে তিনি ইনভেস্টমেন্ট, ফরেন ট্রেড এবং জেনারেল ব্যাংকিংয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতৃত্বের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

আপনার দৃষ্টিতে বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে?

আলতাফ হুসাইন : বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, আন্তঃসংযুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একক কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক একই প্ল্যাটফর্মে নির্বিঘেœ লেনদেন করতে পারবেন, যা নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং ডিজিটাল লেনদেনকে আরও গতিশীল করবে। এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় উদ্যোক্তা সবার জন্য নিরাপদ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যা স্মার্ট ও ক্যাশলেস বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলা কিউআর চালুর ফলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন?

আলতাফ হুসাইন : বাংলা কিউআর চালুর ফলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা একটি অভিন্ন, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা পাবেন। গ্রাহকরা যেকোনো অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর স্ক্যান করে সহজেই মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একাধিক কিউআর প্রদর্শনের প্রয়োজন হবে না। ফলে লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হবে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়বে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ হবে।

আপনার প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের বর্তমান অগ্রগতি কী?

আলতাফ হুসাইন : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি শুরু থেকেই বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আমাদের ঈবষষঋরহ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা বাংলা কিউআর ব্যবহার করে সহজে ও নিরাপদে লেনদেন করতে পারছেন। ২৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক সর্বমোট ২,০৪,৪৩৩টি বাংলা কিউআর অনবোর্ড করেছে এবং ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে একদিনেই সর্বোচ্চ ৭,০৩৭টি বাংলা কিউআর অনবোর্ড হয়েছে, যা এ উদ্যোগে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপক সাড়া এবং আমাদের বাস্তবায়ন সক্ষমতার প্রতিফলন। পাশাপাশি দেশব্যাপী ৪০০টি শাখা, ২৭৬টি উপশাখা এবং প্রায় ২,৮০০টি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি আগামী এক বছরে ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য হলো দেশব্যাপী বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা এবং ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায়ীদের এ প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকান কিংবা গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে বাংলা কিউআর কতটা জনপ্রিয় করা সম্ভব বলে মনে করেন?

আলতাফ হুসাইন : বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকান এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মধ্যেই। সহজ ব্যবহার, কম খরচ এবং যেকোনো অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ থেকে যেকোনো স্থান থেকে অর্থ গ্রহণের সুবিধা তাদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। যথাযথ সচেতনতা, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং ব্যাংকগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বাংলা কিউআর দ্রুতই দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছে একটি জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

গ্রাহকদের মধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবহারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

আলতাফ হুসাইন : গ্রাহকদের মধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডিজিটাল পেমেন্ট সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং ব্যবহারগত অভ্যাসে পরিবর্তন আনা। অনেক গ্রাহক এখনো নগদ লেনদেনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, সহজ ব্যবহারযোগ্য সেবা, ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলা কিউআরের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং এটি দৈনন্দিন লেনদেনের একটি স্বাভাবিক মাধ্যম হয়ে উঠবে।

নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলা কিউআর কতটা নির্ভরযোগ্য এবং প্রতারণা রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? 

আলতাফ হুসাইন : বাংলা কিউআর একটি নিরাপদ ও মানসম্মত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নিরাপত্তা মান ও আন্তঃপরিচালন কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহক সচেতনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতারণা রোধে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং গ্রাহকদের নিরাপদ লেনদেন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আপনার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কতজন মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন এবং আগামী বছরে এই সংখ্যা কত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে? 

আলতাফ হুসাইন : বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির আওতায় ২,০৪,৪৩৩ জন মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ মার্চেন্ট নেটওয়ার্কের একটি। আমাদের লক্ষ্য আগামী এক বছরে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে দেশের আরও বেশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায়ীকে বাংলা কিউআরের আওতায় আনা। বিস্তৃত শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং ঈবষষঋরহ-এর মাধ্যমে মার্চেন্ট অনবোর্ডিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহ প্রদানের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ কতটা রয়েছে?

আলতাফ হুসাইন : সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে বাংলা কিউআর চালু হলে সেবা গ্রহণ ও বিল পরিশোধ আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে, একই সঙ্গে নগদ অর্থের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলা কিউআরকে জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

বাংলা কিউআরকে জাতীয় পর্যায়ে সফল করতে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, পেমেন্ট সেবাদাতা ও সরকারের মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন?

আলতাফ হুসাইন : বাংলা কিউআরের জাতীয় সফলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, পেমেন্ট সেবাদাতা এবং সরকারের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় অপরিহার্য। অভিন্ন প্রযুক্তিগত মান, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারঅপারেবিলিটি, উচ্চমানের সাইবার নিরাপত্তা, যৌথ সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং দ্রুত মার্চেন্ট অনবোর্ডিং নিশ্চিত করতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে এ অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হলে বাংলা কিউআর দেশের সর্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত