সহিংসতা মানুষের নৈতিক পতন ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয় কীভাবে ডেকে আনে এর অনেক নজির আমাদের সামনে আছে। দেশে বিশেষ করে মফস্বল কিংবা গ্রামীণ জনপদে সামাজিক প্রেক্ষাপটে আদিম অসভ্যতা-বর্বরতার ছায়া এখনো কতটা প্রলম্বিত এরই শিহরিত হয়ে ওঠার চিত্র ৩০ জুলাই উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। ‘সভ্য সমাজে টেঁটার অসভ্যতা’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনের গর্ভে ‘টেঁটাযুদ্ধের’ কারণে দেশের বিভিন্ন জনপদে সামাজিক কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধে এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে কী হিংস্রতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে এই উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আর সভ্যতা-মানবতার আলোয় যখন মানব সমাজ উত্তরোত্তর বিকাশের পথে হাঁটছে তখনো আমাদের সমাজের কোনো কোনো অংশ তলিয়ে আছে গভীর অন্ধকারে!
এ ব্যাপারে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে যে তথ্য দিয়েছেন তাতে প্রতীয়মান হয়, আদিম যুগের অপচ্ছায়ার গ্রাসমুক্ত হতে পারেনি আমাদের সমাজের একাংশ। তার ভাষ্য, ‘টেঁটাযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত প্রস্তুতি এবং বিশেষ প্রশিক্ষণ। টেঁটাযুদ্ধ বন্ধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিকভাবে লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। ওই সব জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ যথাসাধ্য চেষ্টা করছে’। একই সঙ্গে অনুসন্ধানে ওই প্রতিবেদনে আরও কিছু উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। জানা যায়, লোহা ও বাঁশের শলাকা কিংবা কঞ্চির সমন্বয়ে কামারশালাগুলোতে গোপনে তৈরি এই মারণাস্ত্র প্রয়োগের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়ে থাকে! চরাঞ্চলে রয়েছে পেশাদার ‘টেঁটাবাহিনী’! ওরা ‘ভাড়াটে’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়! নারী-শিশুদেরও এই প্রাণঘাতী কাণ্ডে যুক্ত করা হয় তা ভাবতে যে শুধু বিস্ময় জন্মে তা-ই নয়, পাশাপাশি এ প্রশ্নও জাগে; আদিম হিংস্রতার হোতাদের শেকড় সমাজের কোন স্তরে প্রোথিত?
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতা এবং প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তি কেবল সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়, এটি হলো ন্যায়বিচার ও সমতার উপস্থিতি।’ আমরা জানি, হিংসার বদলে হিংসা কেবল হিংসাকেই আরও বাড়িয়ে দেয়। অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার দূর করা যায় না, এর জন্য চাই আলো। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা সমাজে এখনো অন্ধকার জিইয়ে রাখতে তৎপর, যারা সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়ে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমতার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার পথ সুগম করার দায়দায়িত্ব যাদের তারা কতটা সফল। আমরা এও জানি হিংসা এমন একটি অনুভূতি, যা মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়, মনকে বিষিয়ে তোলে, আর পারিবারিক-পারিপাশির্^ক সম্পর্কগুলোকেও নষ্ট করে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, শুধু আইন ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাই নয়, সমাজ সচেতন একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
আমরা মনে করি, যেসব জেলা বা উপজেলায় এই বন্যতা থাবা বিস্তার করছে সেসব এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি কুচক্রীদের সামাজিকভাবে বর্জনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মানব জীবনে কয়েকটি শত্রু আমাদের সঙ্গে বসবাস করে। এর মধ্যে লোভ, হিংসা, মোহ এগুলো অন্যতম। ঈর্ষা থেকেও সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ-সংঘাতের উদ্ভব ঘটে। ‘টেঁটাযুদ্ধ’র পেছনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঈর্ষাও অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। খ্যাতিমান ইংরেজ কবি ও ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার উইলিয়াম শেনস্টোন বলেছেন, ‘ঈর্ষা হলো উৎকর্ষতার ভয় বা শঙ্কা; হিংসা হলো তার নিচে আমাদের অস্বস্তি।’ ‘টেঁটাযুদ্ধ’ আমাদের সমাজে এরও ক্ষেত্র তৈরি করছে।
আমরা আরও মনে করি, নজর দিতে হবে উৎসে। যেসব কামারশালায় এই প্রাণঘাতী অস্ত্র তৈরি হয় সেখানেও সমভাবেই গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। ‘টেঁটাযুদ্ধ’ শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য যে আতঙ্ক, অস্বস্তি তৈরির পাশাপাশি সমাজে আদিম ছায়ার পরিসর ক্রমেই বাড়াচ্ছে। এর প্রতিকার-প্রতিবিধানে দ্রুত
যথাযথ আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। সভ্যযুগে এমন অসভ্যতা কোনোভাবেই গ্রাহ্য করা যায় না।
