জুলাই শহীদদের কথা বলছে কি বাংলাদেশ

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৪ এএম

২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা প্রত্যাহার করে। ২০২৪ সালে ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আবারও রাস্তায় নামেন। ২০২৪ সালের জুন মাসে এই আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে এবং জুলাই মাসের শুরু থেকে তীব্র আকার ধারণ করে। ১৫ জুলাই আন্দোলন সংঘর্ষে রূপ নেয়। ১৬ জুলাই আবু সাঈদের মৃত্যু এই আন্দোলনকে তীব্র গতিদান করে। নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তীব্র রূপ লাভ করছিল। এ সময় শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান শিক্ষক ও অভিভাবকরা। কোটাবিরোধী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণআন্দোলনে। ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এই আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হলেও অধিকাংশ জুলাইযোদ্ধা বঞ্চিত হয়েছেন এমনটাই তাদের অভিমত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে জুলাইযোদ্ধারা তুলে ধরেছেন জুলাই আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনের কথা, তাদের স্বপ্ন ও জুলাই-পরবর্তী দুই বছরের বাস্তবতা। প্রশ্ন তুলেছেন, জুলাই শহীদদের স্বপ্নের কথা কি বলছে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ?

শরীরে ৭৪টি ছররা গুলি বয়ে বেড়াচ্ছি, হারিয়েছি বাম চোখের দৃষ্টি

জসীমউদ্দিন খান

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়তাম। আমি অ্যাটাচটেড ছিলাম বিজয় একাত্তর হলে। আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলাম, হলেই থাকতাম। সে অবস্থায় আন্দোলনে যোগ দেওয়া সহজ ছিল না। বর্তমানে স্নাতকোত্তরে পড়ছি। জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ায় ইয়ার গ্যাপ গেছে। ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়ে এখন ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে আছি।

আমার আন্দোলনে যোগদান জুলাইয়ের আগে। ৫ জুনের মিছিলে আমিও ছিলাম। পহেলা জুলাই থেকে প্রতিদিনই আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত ছিলাম। আমি তখন চাকরিপ্রার্থী ছিলাম। আঠারো সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেই আন্দোলনের ফলে বাতিল হওয়া কোটা যখন আবার ফেরত এলো তখন প্রচণ্ড ক্ষোভ কাজ করছিল। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে আওয়ামী নির্যাতনের শিকার ছিলাম। সব মিলিয়ে আন্দোলনে গিয়েছিলাম কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু সরকারের দমন পীড়নের পর, ১৫ জুলাই থেকে আন্দোলন শুরু করি স্বৈরাচার পতনের দাবি নিয়ে। ১২ জুলাই শাহবাগে যারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙেছিল তাদের একজন ছিলাম।

যারা আন্দোলন করেছেন তারা সবাই আত্মত্যাগ করেছেন নানাভাবে। পুলিশের ছররা গুলি খেয়ে আহত হয়েছি। শরীরে এখনো ৭৪টি ছররা গুলি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। হারিয়েছি বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি।

কোটার সংস্কার ছাড়া আর কোনো সেক্টরের তেমন কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে গিয়েছিলাম সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

প্রত্যাশা করি মানুষ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে জুলাইয়ে জীবন দিল, সেই বাংলাদেশের জন্য প্রতিটা মানুষ যেন তার আওয়াজ জারি রাখে। কেউ যেন নতুন ফ্যাসিবাদের দালাল না হয়ে ওঠে।

মেডিকেলের কাগজ নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরা লজ্জা এবং অপমানের

রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চংগ্যা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম। বর্তমানে আমি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত। একটি ইংরেজি দৈনিকে পত্রিকায় ব্যবসা ও অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে লেখালেখি ও সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত আছি।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে আমি সক্রিয়ভাবে রাজপথে নামি। বিশেষ করে ১৫ জুলাই মেয়েদের ওপর যখন হামলা চালানো হয় সেদিন নিজেকে ঘরে ধরে রাখতে পারেনি। মনে হয়েছিল, এই সময় চুপ করে থাকা যাবে না।

আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল। ৪ আগস্ট বিকেলে আমার ভাইকে কাউন্সিলর আসিফের লোকজন ধরে নিয়ে যায়। সেদিন ৬টা থেকে কারফিউ শুরু হয়। আমি সকাল ১০টা থেকেই শাহবাগে ছিলাম। ৬টা ৩০ মিনিটের পর থেকে বাংলামোটরে গোলাগুলি শুরু হয়। সেই সময় আমরা ৭ জন নারী আন্দোলনকারী ছিলাম। শাহবাগ থেকে এলিফ্যান্ট রোড পার হয়ে হাতিরপুল এবং সেন্ট্রাল রোডের গলি ধরে মিরপুর রোড দিয়ে বের হয়ে ধানম-ি যেতে যেতে সন্ধ্যা ৭টা বেজে যায়। সেই সময় আমরা ছিলাম ৩ জন। তখন জানতে পারি আমার ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু কে ধরে নিয়ে গেছে সেটা জানতাম না। আমার মাকে জানানো হয় যে, থানা থেকে ফোন দেওয়া হয়েছে। আমরা ৩ জন প্রথমে মোহাম্মদপুর থানায় যাই। উনারা বলেন তেজগাঁও থানায় যেতে। মাও ভাইয়ের খোঁজে বের হন। তিনি যখন বাসস্ট্যান্ড থেকে থানার দিকে হেঁটে আসছেন ঠিক সেই সময় তার ওপর হামলা হয়। আমরা আওয়াজ শুনে ছুটে গেলে সেইদিন আমাদের ওপরও হামলা হয়। চারজন নারীর গায়ে হাত দেওয়া, ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা ও মারধর করা হয়। সেই ট্রমাগুলো এখনো মনে পড়ে। আমার কানের পাশ দিয়ে দায়ের কোপ চলে গিয়েছিল। পরে আমাদের বাসার দারোয়ান আমাদের ফোন দিয়ে জানান, আমার ভাই রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাসায় এসেছেন। সেই দিন আর রাতটা ছিল খুবই ভয়ংকর আর দুর্বিষহ।

আমি শারীরিকভাবে আহত না হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা গ্রহণ করিনি। তবে আমার ভাই আহত ও ক্ষতির শিকার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য পায়নি। আমার ভাই গুরুতর আহত হয়েছিল। তার দুই হাত এবং হাতের আঙুল ভাঙ্গা হয়েছিল। সারা শরীরে কালো কালো আঘাতের চিহ্ন ছিল। আমার ভাইয়ের পেছনে আমাদের প্রায় ৭০ হাজার টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে পড়ে। আমার ভাইয়ের নাম অরণী অহীন তঞ্চংগ্যা। আমাদের মেডিকেল কাগজপত্র সব জমা দেওয়া হয়েছে। একাধিকবার জমা দেওয়া হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এমন একটা অবস্থা তৈরি করল যেকোনো ভদ্র মানুষ এসব জটিলতার মধ্যে দিয়ে সামান্য টাকার জন্যে যেতে চাইবে না।

আর শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আহতদের চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নিহতদের পরিবারের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু যেই রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে, এইভাবে নিজেদের কাহিনি লিখে মেডিকেলের কাগজ নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরা লজ্জা এবং অপমানের।

আমরা শুধু সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করিনি; রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিলাম। কিন্তু এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন, দখলদারিত্ব, সহিংসতা এবং ভিন্নমত দমনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদানও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি। একইভাবে আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষাও জাতীয় সংস্কারের আলোচনায় প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। আমি এই বিষয়ে বেশ হতাশ ।

একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে দুই বছর পর আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া হলোআন্দোলনের ইতিহাস যেন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তিতে পরিণত না হয়। এই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী, নারী, শ্রমিক, পেশাজীবী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সবার অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃত হতে হবে। নারী, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত না হলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণ হবে না।

সাংসদের পরিবারের সদস্যদের দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে

ওয়াহিদ ইসলাম অনিক

আমি আন্দোলনের সময় রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের বিবিএ (ব্যবস্থাপনা) বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম। তবে বসবাস করতাম মিরপুর এলাকায়। এখনো তিতুমীর কলেজে অধ্যয়নরত।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সাধারণ ছাত্র-জনতার ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে প্রথম রাস্তায় নামি। এ দিন ঢাকা শহর ছিল কার্যত রণক্ষেত্র। কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামা ছাত্রদের ওপর নির্মম নির্যাতন, আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ এবং একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ছাত্রদের আন্দোলনে মৌন সমর্থনে তাদের সঙ্গী হয়েছিলাম। সেদিনই পুলিশের আক্রমণে আমার ডান হাতের কাঁধের জয়েন্ট সরে যায়। মিরপুরে দশ নম্বর গোল চত্বর থেকে দুই নম্বরের মোড় পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়। সেখানেই একপর্যায়ে আমি আহত হই। পরে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে আসি নিরাপত্তার অভাবে। আজ অবধি চিকিৎসা করাতে হচ্ছে এবং আঘাতের ধকল সহ্য করতে হচ্ছে।

আমার দেখা অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা ছিল মিরপুর স্টেডিয়ামের ৪ নম্বর গেটের সামনে একজনের প্রায় পুরো শরীরে ছড়রা গুলি ঢুকে জর্জরিত হতে দেখা। যা ছিল খুবই ভয়ংকর। একই দিনে আমার শরীরেও প্রায় ১০-১২টি ছররা গুলি দেহের বিভিন্ন অংশে ঢুকে যায়।

জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে বেশ কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ হয়েছি। তাদের নানা ধরনের টালবাহানা দেখে পরবর্তী সময়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

যে অন্যায়, অবিচার, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, রাষ্ট্র এবং মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান অধিকারের দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম তার তেমন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে গত নির্বাচনে নিজের ভোট নিজে দিয়েছি এবং সুষ্ঠু হয়েছে বলে মনে হয়েছে।

পটপরিবর্তনের পর, শুরুর দিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা গেলেও রাষ্ট্রের সিস্টেমতন্ত্র ফের আগের নিয়মে ফিরে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এখনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে। যা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, এসব দেখলে মর্মাহত হই।

একজন নাগরিক হিসেবে দাবি, দেশের প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জনপ্রতিনিধিসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-অনিয়ম, অত্যাচার, স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা দরকার। ৩০০ সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে, সরকারি সেবা সহজলভ্য করতে হবে, জনগণের করের টাকার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং দেশের অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। সব ধরনের আইন ও বিচারবহির্ভূত আগ্রাসন বন্ধ করে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে বলে মনে করি।

জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের জন্য সুবিচার চাই

আসিফ মাহমুদ

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় আমি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটিতে (ওঝট) ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম। বর্তমানে একটি বেসরকারি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি।

আমি সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে প্রথম সম্পৃক্ত হই ১৮ জুলাই। সেদিন দেশের অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমিও রাস্তায় নেমে আসি এবং রামপুরা ব্রিজে অবস্থান নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানাই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মূলত সেই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই আমি রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছিলাম।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বড় কোনো শারীরিক ক্ষতির শিকার হইনি। তবে ৪ আগস্ট দুপুরের পর আমার একজন সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হন। তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে শাহবাগে ফিরে দেখি চারদিক ফাঁকা এবং কারফিউ জারি হয়ে গেছে। সে সময় পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে নিরাপদে বাসায় ফিরতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

আন্দোলনের নামার প্রথম দিন সকালে আমাদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হয়, পুলিশের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন করতে হয়। সবার আস্থায় শেষ পর্যন্ত আমাদের তিনজনের একটি ছোট দল তৈরি হলো, নুহাস ভাই, আদিল এবং আমি। আমরা সরাসরি পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গেলাম।

আমরা পুলিশ কর্মকর্তাদের খুব স্পষ্টভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, আমাদের ওপর যেন কোনো ধরনের হামলা চালানো না হয়। আমরা তাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, আমাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আমরা কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়াতে চাই না, শুধু আমাদের অবস্থান থেকে প্রতিবাদটুকু চালিয়ে যাব। কিন্তু আমাদের সেই শান্তির আহ্বান এবং আশ্বাসের বিন্দুমাত্র মূল্য তারা দেয়নি। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই হঠাৎ করেই পুলিশ আমাদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায় এবং শুরু হলো এক ভয়াবহ সংঘাত। সেই দিনের সংঘাত, মৃত্যু আমি বোধ হয় চাইলেও কখনো ভুলতে পারব না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই সরাসরি কোনো সহায়তা চাইনি, তাই তা পাওয়ারও কোনো প্রশ্ন আসে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্দোলনে আহত আমার কিছু বন্ধু ও সহযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, সরকারের পক্ষ থেকে সবাইকে আশানুরূপ বা পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া হয়নি। যদিও এটা সত্য যে, কিছু আহত যুবক সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে সহায়তা পেয়েছেন, তবে এটাও অনস্বীকার্য যে এদের মধ্যে কিছু মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন, যেটা যাদের বেশি ছিল প্রয়োজন তাদের বঞ্চিত করেছে। জুলাই আন্দোলনে যে স্বপ্ন নিয়ে অংশ নিয়েছিলাম তার প্রায় পুরোটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে।

নতুন বাংলাদেশে আমি জুলাইয়ের প্রতিটি শহীদের রক্ত ও আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন দেখতে চাই। কোনো বিশেষ দল বা মতের তোয়াক্কা না করে, এ দেশ যেন সত্যিকার অর্থেই একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া। জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের জন্য সুবিচার চাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত