কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশে থাকা তিতাস গ্যাসের উচ্চচাপের মূল সঞ্চালন পাইপলাইনে প্রায় ৪৫ দিন ধরে লিকেজ অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস অপচয়ের পাশাপাশি নদীপাড়ের বাসিন্দারা তীব্র গ্যাসের গন্ধে আতঙ্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। লিকেজ বন্ধে মেরামতকাজ চললেও এখনও পুরোপুরি গ্যাস নির্গমন বন্ধ হয়নি।
কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশে থাকা পাইপলাইনে এ লিকেজের ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাস নির্গমনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। প্রতিদিন ঘটনাস্থলে শতশত উৎসুক মানুষ ভিড় করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চুন কারখানায় গ্যাস সরবরাহের উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে উচ্চচাপের পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হলে পাইপে ছিদ্র হয়ে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে কচুরিপানা দিয়ে লিকেজের স্থান আড়াল করার চেষ্টা করা হলেও পানির ওপর গ্যাসের বুদবুদ ও তীব্র গন্ধে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। অভিযোগ ওঠার পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায় এবং মালিক-শ্রমিকরা এলাকা ত্যাগ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতে নদীতীরবর্তী প্রায় ১৭ শতাংশ জমিতে একটি চুন কারখানা স্থাপন করা হয়। কারখানাটির মালিক সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দেলোয়ার হোসেন তালুকদার।
স্থানীয় বাসিন্দা জহির উদ্দিন বলেন, প্রায় দেড় মাস ধরে গ্যাস লিক হচ্ছে। শুরুতে অল্প পরিমাণ গ্যাস বের হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, নিম্নমানের মেরামতকাজ ও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগের সঙ্গে অসাধু চক্র এবং গ্যাস বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় এক মাস পর তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে গত ৯ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেরামতকাজ শুরু হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, নদীর তলদেশ থেকে তখনো গ্যাস বের হচ্ছিল এবং তিতাস গ্যাসের কর্মীরা মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
লিকেজ মেরামতের দায়িত্বে থাকা নোমান মিয়া বলেন, পাইপলাইনের ওয়েল্ডিং অংশে বড় ধরনের ছিদ্র হওয়ায় মেরামতকাজ জটিল হয়ে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ২০ থেকে ২৫ জন কর্মী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে লিকেজ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
কিশোরগঞ্জ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, লিকেজের কারণে পাইপলাইনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিশোরগঞ্জ জেলার গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং পাইপলাইনের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এ লাইনের মাধ্যমে জেলার প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক গ্যাস সুবিধা পান।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ লিকেজ বন্ধে কাজ করছে এবং প্রশাসন নিয়মিত বিষয়টি তদারকি করছে। লিকেজ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে, অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তিতাস কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নেবে এবং প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
উল্লেখ্য, প্রায় দেড় মাস ধরে উচ্চচাপের পাইপলাইন থেকে গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলেও এখনও দায়ীদের শনাক্ত করা যায়নি এবং এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী দ্রুত লিকেজ বন্ধ, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
