‘আচিক’ ভাষা রক্ষায় গারোদের লড়াই

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১২ এএম

গারো জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা আচিক হারিয়ে যাওয়ার হুমকিতে পড়েছে। মধুপুর গড় অঞ্চলের বিভিন্ন পাড়া ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, নতুন প্রজন্মের সিংহভাগ শিশুই তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা বলতে পারছে না।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, অতীতে মধুপুর অঞ্চলের গারোরা আচিক ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতেন না বা ব্যবহার করতেন না। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও বেঁচে থাকার তাগিদে এসেছে আমূল পরিবর্তন। জীবন-জীবিকা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বনের সন্তানরা আশপাশের বাঙালিপ্রধান এলাকায় আসতে শুরু করেন। তারা জানায়, স্কুল-কলেজে গারো শিক্ষার্থীদেরও বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয়। কর্মজীবনেও অফিস-আদালতসহ সব প্রাত্যহিক কাজেই তাদের বাংলা ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাবে পরিবার ও সমাজ থেকে আচিক ভাষার চর্চা প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সোয়া লাখ গারো আদিবাসী রয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজারের বসবাস টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলে। সম্প্রতি জলছত্র ও জয়েনশাহী সংলগ্ন পাড়াগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলপড়–য়া শিশুরা তাদের মাতৃভাষা ভালোভাবে বলতেই পারে না। কেউ কেউ নিজ বাড়িতে মা-বাবার মুখে শুনে এই ভাষা কিছুটা বুঝতে শিখলেও, তারা নিজেরা আচিক ভাষায় কোনো উত্তর দিতে পারে না। মা-বাবা নিজের ভাষায় ডাকলেও উত্তর আসে বাংলায়।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের নেতা অজয় এ মৃ জানান, আচিক ভাষার লিখিত কোনো বর্ণমালা নেই। কথিত আছে, দুর্ভিক্ষপীড়িত তিব্বত অঞ্চল ত্যাগ করে গারোরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে আসছিলেন, তখন যার কাছে পশুর চামড়ায় লিখিত আচিক ভাষার পুঁথি-পুস্তকাদি ছিল, সেই ব্যক্তি পথে ক্ষুধার জ্বালায় সব পুঁথি-পুস্তক সেদ্ধ করে খেয়ে ফেলেন। ফলে আচিক ভাষার বর্ণমালা চিরতরে হারিয়ে যায়। তবে গারোদের মুখে মুখে আচিক ভাষার প্রচলন ছিল।

এ প্রসঙ্গে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন মধুপুর শাখার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ঝুমুর মৃ জানান, মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য তারা নিজেরা বাড়িতে সব সময় আচিক ভাষায় কথা বলেন। তবু তাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সঙ্গে ক্রমেই মিশে যাচ্ছে। 

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে গড় এলাকায় ১২টি স্কুল চালু করা হয়েছিল; যেখানে গারো শিশুদের আচিক ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হতো। তিন বছর চলার পর দাতা সংস্থার অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়।

আদিবাসী লেখক রাখী ম্রং জানান, ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতিমালায় শিশুদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। গারো শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এ ভাষা হারিয়ে ফেলবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত