বাংলাদেশে যে ৫০টির অধিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে কড়া সম্প্রদায়। সংখ্যায় অতি অল্প এ জাতি বাংলাদেশে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। পূর্বপুরুষরা শিক্ষিত না হলেও বর্তমানে কড়া সম্প্রদায়ের সন্তানরা শিক্ষার আলোয় আসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে না বলে আক্ষেপ তাদের।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার হালজায় ঝিনাইকুড়ি গ্রামে বসবাস করে কড়া সম্প্রদায়ের ২৪টি পরিবার। প্রায় সাড়ে ৩শ একর জমির ওপর তাদের বসবাস। সদর উপজেলায় রয়েছে আরও চারটি পরিবার। ব্রিটিশ আমলে রেললাইন তৈরির কাজের সময় তারা ভারতের ঝাড়খ- বা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে এসেছিল। তাদের পেশা ছিল মূলত মাটি কাটা ও রেললাইনের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা। এর পর থেকেই তারা এখানে বাসবাস করছেন।
জানা গেছে, অতীতে এই কড়া সম্প্রদায়ের কোনো নারী বা পুরুষ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি। তবে সেই অতীতকে পেছনে ফেলে আলোর পথে আসছেন এ সম্প্রদায়ের শিশুরা। এ সম্প্রদায়ের যুবক লাপোল কড়া উচ্চ মাধ্যমিকের গ-ি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সুযোগ পান। তার দেখাদেখি এ সম্প্রদায়ের সন্তানদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ দেখা দেয়। এখন অন্তত ১৭ জন সন্তান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে।
ঝিনাইকুড়ি গ্রামে অবস্থিত রাঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৬৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কড়া সম্প্রদায়ের ৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু আনাস ও সহকারী শিক্ষিকা বিউটি দেব শর্মা জানান, কড়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তাই এ ভাষার শিক্ষার্থীদের প্রথম দিকে ভাষাগত কিছু সমস্যা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা মানিয়ে নিয়েছে। এখন তারা বাংলা ভাষায়ই পড়ালেখা করছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছবিলাল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘কড়া সম্প্রদায়ে অভিভাবক সমাবেশ করে সন্তানদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার বিষয়ে চিন্তা করছি। উপবৃত্তি দেওয়ার বিষয়েও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।’
বিরল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রেজাউল ইসলাম জানান, কড়া সম্প্রদায়ের একটা পাঠাগার রয়েছে। পড়াশোনার সুবিধার জন্য সেখানে ফ্যানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ে পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে একাধিকবার সভাও করা হয়েছে।
কড়া সম্প্রদায়ের দুজন বর্তমানে ঢাকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তার একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিষয়ের শিক্ষার্থী লাপোল কড়া। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা শিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করছি। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যরা চাকরিতে কোটার সুবিধা পায়। কিন্তু কড়া সম্প্রদায় কোনো সুবিধা পায়নি। এ জন্য সরকার এগিয়ে না এলে লাভ হবে না।’
কড়া সম্প্রদায়ের প্রধান যগেন কড়া বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের দিকে না দেখে তাহলে আমাদের সন্তানরা কী করবে?’
