নিজের দুই চোখে কোনো আলো নেই, কিন্তু দেখার স্বপ্ন আছে অসীম। ব্রেইল পদ্ধতির বইয়ের অভাব, শ্রেণিকক্ষে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশের অনুপস্থিতি আর পদে পদে আর্থিক টানাপোড়েন। এতসব ‘নেই’ এর ভিড়েও যা ছিল, তা হলো অদম্য একাগ্রতা।
শত প্রতিকূলতার দেয়াল টপকে চলতি বছরের মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় ৩.৬১ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন চট্টগ্রাম ফটিকছড়ির মেয়ে লাকী আকতার। তাঁর চোখজুড়ে এখন একটাই স্বপ্ন, উচ্চশিক্ষা শেষ করে একদিন তিনি হবেন আদর্শ শিক্ষক।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরী লাকী আকতার নগরীর হামজারবাগ এলাকার রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। ওই বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর আট শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়, যাদের মধ্যে লাকীর মতো দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ছিল ৯ জন। কৃতকার্য হওয়া ৭ জনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছেন লাকী।
রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কয়েক কদম এগোলেই শাহজাহান হাউজিং সোসাইটি। সেখানে একটি সংগঠন পরিচালিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের হোস্টেল ‘অপলা সুইট হোম’ এ থাকেন লাকী। সঙ্গে থাকেন চট্টগ্রাম কলেজ পড়ুয়া তার বোন মরিয়ম আকতার। যিনি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ফল প্রকাশের পর দুপুরে ওই মেসে বসে কথা বলতেই লাকীর চোখেমুখে ফুটে ওঠে জয়ের উচ্ছ্বাস।
তবে এই আনন্দের পেছনের পথটা একেবারেই মসৃণ ছিল না। লাকী বলেন, শ্রুতিলেখকের জটিলতাই তাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। শ্রুতিলেখক জটিলতায় গত বছর আমি সব পরীক্ষায় বসতেই পারিনি। এবার যে শ্রুতিলেখক পেয়েছিলাম, সে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার জন্য নবম-দশমের পড়াগুলো একেবারেই নতুন ছিল। অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে হয়েছে। সে কতটুকু বুঝে লিখেছে জানি না। শ্রুতিলেখক সমসাময়িক কেউ হলে ফলাফল হয়তো আরও ভালো হতো। তবুও যা পেয়েছি, তাতেই আমি খুশি।
পড়াশোনার পদে পদে থাকা প্রতিবন্ধকতার কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে গলা ধরে আসে লাকীর। অশ্রুসজল কণ্ঠে তিনি বলেন, আমাদের পড়ার মতো ব্রেইল বই ছিল না। শিক্ষকরা সেভাবে গাইড করতেন না। শুনে শুনে যতটুকু পেরেছি, আয়ত্ত করেছি। আমি দু-একটি পুরোনো ব্রেইল বই পেলেও অন্য অনেকে তা-ও পায়নি।
পরীক্ষার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষা আমাদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। পড়াশোনা নয়, শ্রুতিলেখক খুঁজতেই নাভিশ্বাস উঠে যায়। স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক পাওয়া যেত না, কারণ তখন সবারই পরীক্ষা চলত। তখন শুধু কান্না করতাম। এর ওপর এসএসসি পরীক্ষা দিতে গিয়ে শ্রুতিলেখকের খরচসহ প্রায় ১৫ হাজার টাকা লেগে গেছে, যা আমাদের জন্য বিশাল বোঝা।
সব বাধা পেরিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা শোনালেন লাকী। বলেন, আমার স্বপ্ন আমি বড় হয়ে শিক্ষক হব। তবে কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবার সাথে মিশে শিক্ষকতা করতে চাই। তার আগে কোনো সরকারি কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছে।
লাকীর এই সাফল্যে গর্বিত তার শিক্ষকেরাও। রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষক নুর নাজমা আক্তার বলেন, লাকীর পড়ালেখার প্রতি অদম্য আগ্রহ। সে সবসময় ক্লাসে উপস্থিত থাকত এবং মনোযোগ দিয়ে শুনত। আমি তাকে উৎসাহ দিতাম, সেও সেভাবে পড়া তৈরি করে আনত। ওর এই ফলাফলে আমরা সবাই গর্বিত।
