হরমুজ দখলের হুমকি ট্রাম্পের, পাল্টা চ্যালেঞ্জ ইরানের

চলমান সংঘাতের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ‘ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১০ এএম

চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ‘ভূখণ্ড’ বা সীমানা হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিউইয়র্কে আয়োজিত এক জনসভায় সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, বৈশ্বিক খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে।

ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প হেসে বলেন, ‘ইরান চরমভাবে পরাজিত হচ্ছে। তাদের আমরা পুরোপুরি পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান আক্রমণ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইরানও বিশ্ববাজারে মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহের মূল রুট বা ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচল সীমিত করে দেয়। যুদ্ধের আগে এই প্রণালীটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইস্যুটি।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই এলাকায় ফের সংঘাত শুরু হয়েছে। গত জুনে সামরিক অভিযান বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলে ইরানকে ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে উভয় পক্ষই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে এবং জুনের শেষ নাগাদ যুদ্ধ আবার শুরু হয়।

বর্তমানে দু'দেশের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর আলোচনা চললেও যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে থামেনি। ইরান দাবি করছে, প্রণালীর একটি অংশ তাদের নিজস্ব জলসীমার মধ্যে পড়েছে, তাই এর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। এ কারণে তারা বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিজেদের অবরোধ জোরদার করেছে। চলতি সপ্তাহেই ইরানি বন্দরে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগে একটি কার্গো জাহাজে গুলি চালায় মার্কিন বাহিনী।

শুক্রবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের এক সভায় নিজের এই সামরিক অবরোধের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘মনে রাখবেন, আমরা যা করছি তা বিশ্বের জন্য একটি মহান সেবা। এটি শুধু আমাদের নিজেদের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য। আমাদের এই অবরোধ অপরাজিত, এটি ইস্পাতের এক প্রাচীর।’

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারণায় অংশ নিতে ট্রাম্প নিউইয়র্ক সফরে গিয়েছিলেন। এই নির্বাচনটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকা না-থাকা এর ওপরই নির্ভর করছে। র্যালিতে ট্রাম্প বারবার ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের দাবি করলেও বাস্তবে এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যে এই যুদ্ধ মোটেও জনপ্রিয় নয়। জুলাইয়ের শেষের দিকে প্রকাশিত এক ‘কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়’ জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছেন। এছাড়া সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, গোলাবারুদের ঘাটতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিকল্প পথও সীমিত হয়ে আসছে।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প বলেছেন যে ইরান পরাজিত হওয়ার পর তিনি হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। তবে হরমুজ প্রণালী কোনো টুইট, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, ডিক্রি জারি বা নির্বাচনী ভাষণের মাধ্যমে দখল করা সম্ভব নয়। ইরান কোনো হুমকি বা শক্তির মহড়ায় ভয় পায় না।’

বর্তমানে উভয় দেশই এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক বা টোল বসানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। গত মাসে ট্রাম্প প্রস্তাব করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালীর ‘অভিভাবক’ হতে পারে এবং পাস হওয়া যেকোনো পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি আদায় করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচলের নিশ্চয়তা থাকায় এই ধরণের শুল্ক আদায় সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।

অন্য দেশের ভূখণ্ড বা সীমানা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছার কথা ট্রাম্প এবারই প্রথম বলেননি। ২০২৫ সালে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘ক্রমবর্ধমান জাতি’ হিসেবে গড়ার রূপরেখা দিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি কানাডা এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর তাঁদের সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছেন।

এদিকে শুক্রবারের শুরুতে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্প জানান, কয়েক দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানকে আরও দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন করতে তিনি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবেন। আর পৃথক এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আসার দিনগুলোতে ইরানের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করতে পারে ওয়াশিংটন।

সূত্র: আলজাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত