মাসের বেতন ১২০০ টাকা!

কমলগঞ্জের চা বাগানে আলো ছড়াতে গিয়ে অন্ধকারে শিক্ষকরা

যে শিক্ষকরা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অন্ধকারের বৃত্ত থেকে বের করে স্বপ্নের আলো দেখাচ্ছেন, দিনশেষে তাদের নিজেদের জীবনই ঢেকে থাকে অনাহার আর চরম অবহেলার গভীর অন্ধকারে।

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

মাস শেষে সম্মানী মাত্র ১২০০ টাকা! রূপকথা কিংবা অতীতের কোনো গল্প মনে হলেও বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে এটিই এক নির্মম ও কূটাভাসপূর্ণ বাস্তবতা। এই যসামান্য টাকাতেই বছরের পর বছর ধরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চা বাগান বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। সংসার চালানো তো বহুদূর, যেখানে প্রতিদিনের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে চরম হিমশিম খেতে হয়, সেখানে স্রেফ পেশাগত দায়বদ্ধতা আর শিশুদের প্রতি অপরসীম ভালোবাসার টানে তারা অব্যাহত রেখেছেন পাঠদান।

প্রতিটি নতুন সকালে বই-খাতা হাতে চেপে ধরে বাগানের ঝরা পাতার পথ পেরিয়ে স্কুলে ছুটে আসে নিষ্পাপ শিশুরা। তাদের কারও চোখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, কেউ হতে চায় শিক্ষক, আবার কেউবা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। শিশুদের এই সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের প্রথম বুনিয়াদ ও ভিত্তি তৈরি করে দেন যেসব কারিগর, মাস শেষে তাদের হাতে উঠে আসে মাত্র বারো শত টাকার এক প্রহসনমূলক সম্মানী।

কমলগঞ্জের চা বাগানগুলোতে যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত নিয়ম করে শ্রেণিকক্ষে যান, মনযোগ দিয়ে পাঠদান করেন, শিক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ন করেন এবং তাদের পড়াশোনার সার্বিক খোঁজখবর রাখেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাস শেষে তাদের অর্জিত এই মাসিক সম্মানী একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের এক দিনের বা দৈনন্দিন আয়ের চেয়েও অনেক কম।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের অক্ষর জ্ঞানই দেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথ দেখান, বড় হওয়ার স্বপ্ন বোনেন। কিন্তু সেই জ্ঞানের কান্ডারিকেই যদি দিনশেষে এই পরিমাণ সম্মানী দেওয়া হয়, তবে স্বভাবতই মানবিক প্রশ্ন ওঠে-বর্তমান বাজারব্যবস্থায় এই সামান্য টাকায় কি একজন শিক্ষকের জীবন রক্ষা পায়?

বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে একজন শিক্ষক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, এত কম টাকা দিয়ে বর্তমান সময়ে সংসার চালানো খুবই কঠিন। তারপরও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা কষ্ট সয়ে পড়িয়ে যাচ্ছি।.

তিনি আরও যোগ করেন, বেতন বাড়ানোর জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদেরও তো পরিবার আছে, সন্তান আছে, তাদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে হয়। এই সামান্য টাকায় বর্তমান যুগে কোনোভাবেই চলা সম্ভব নয়।

চা বাগানের এই অবহেলিত বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিন শিক্ষা গ্রহণ করছে হাজারো শিশু। যাদের কাঁধে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ গড়ার গুরুদায়িত্ব অর্পিত, সেই শিক্ষকরাই বছরের পর বছর ধরে সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির কারণে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, তখন একজন শিক্ষকের মাসিক সম্মানী ১২০০ টাকা থাকাটা শুধু কোনো আর্থিক সংকট নয়; এটি শিক্ষকদের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত অবহেলার এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

শিক্ষকরা যে বাগানের শিশুদের কতটা প্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্র, তা উঠে এসেছে এক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে। নিষ্পাপ কণ্ঠে এক শিশু শিক্ষার্থী বলে, আমাদের স্যার এবং ম্যাডামরা আমাদের অনেক যত্ন নিয়ে ভালো পড়ান, কিন্তু তাদের বেতন মাত্র ১২০০ টাকা, যা খুবই কম। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আকুল অনুরোধ জানাচ্ছি, আমাদের প্রিয় স্যার-ম্যাডামদের বেতন যেন দ্রুত বাড়ানো হয়।

বিদ্যালয়গুলোর এই দৈন্যদশা ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।

এ বিষয়ে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আনিছুর রহমান জানান, মৌলভীবাজার জেলায় মোট ৬১টি বেসরকারি চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো মূলত সংশ্লিষ্ট চা বাগান কর্তৃপক্ষ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমরা সরকারিভাবে শুধু তাদেরকে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করে সহযোগিতা করি।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে (সিংক) বাগানের শিক্ষার সার্বিক পরিস্থিতি ও শিক্ষকদের বিদ্যমান অবস্থা তুলে ধরেন।

চা বাগানের এই আত্মত্যাগী শিক্ষকরা কারও দয়া বা করুণার পাত্র হয়ে বাঁচতে চান না। তারা চান তাদের মেধা ও শ্রমের ন্যায্য মূল্য, চান সম্মানজনক বেতনভাতা এবং একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

অবশেষে একটাই গভীর প্রশ্ন থেকে যায়—যাঁরা পরম মমতায় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিক্ষার আলোকবর্তিকা দেখাচ্ছেন, তাঁদের নিজেদের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে সেই আলোর ছোঁয়া পৌঁছাবে কবে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত