রেয়াজউদ্দিন বাজারে ১৬০ কোটি টাকার ক্ষতি

  • কোথাও কোমরসম পানি, কোথাও হাঁটু পরিমাণ
  • ৩৫ বছরে এত পানি দেখেনি ব্যবসায়ীরা  
আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

রেয়াজউদ্দীন বাজারের আমতল মোড় থেকে একটু সামনে এগুলোই বাহার লেইন। এই লেইনে ইকরা ফেব্রিকসের ম্যানেজার জানে আলমের জীবন ও যৌবন পুরোটা কেটেছে রেয়াজ উদ্দীন বাজারে। ৩৪ বছর ধরে বিভিন্ন দোকানে কাজ করেন তিনি। কিন্তু সোমবারের মতো এত পানি বাজারে কখনও দেখেননি।

তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টি হলে রেয়াজ উদ্দীন বাজারে পানি উঠে। কিন্তু এত পানি এর আগে কখনও উঠেনি। আমি সকাল নয়টার দিকে এসে দেখি এক কোমড় পানি। নীচে থাকা সব কাপড় ভিজে গেছে। আনুমানিক সাড়ে ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। 

ইকরা ফেব্রিকসের পাশের দোকান আল আকসা শাড়ীজ। বিকেল ৬ টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায় দোকানজুড়ে মেলে রাখা হয়েছে ভেজা শাড়ী। পাশেই বসে আছেন ম্যানেজার। দোকানি মো. গিয়াস উদ্দিনের বরাতে তিনি বলেন, নীচের তাকের সব শাড়ী নষ্ট হয়ে গেছে। যার আনুমানিক মূল্য সাত থেকে আট লাখ টাকা।

ইকরা ফেব্রিকস বা আকসা শাড়ীজ নয়, চট্টগ্রাম নগরীতে টানা ভারী বর্ষণে রেয়াজ উদ্দীন বাজারের অধিকাংশ দোকানই পানি ঢুকে গেছে। এতে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। 

রেয়াজ উদ্দীন বাজার চট্টগ্রাম মহানগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য কেন্দ্র। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের খুব কাছে অবস্থিত প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই বাজারে বর্তমানে দুই শতাধিক ছোট-বড় মার্কেটজুড়ে দশ হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। কাপড় থেকে শুরু করে সব ধরনের মালামাল এই বাজারে পাওয়া যায়। সোমবার সকাল ৯ টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। যার মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত এই তিন ঘণ্টাতেই হয়েছে ১০৯ মিলিমিটার অতি ভারী বর্ষণ। এতেই নগরীর অন্যান্য এলাকার মতো এই বাজারেও গোড়ালি থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। ভিজে যায় কাপড় থেকে শুরু করে ভোগ্যপন্য। 

অন্যদিকে রেয়াজ উদ্দীন বাজারের পাশের বিভিন্ন মার্কেট নিয়ে গঠিত তামাকুমন্ডি লেইন বণিক কল্যান সমিতি। এই সমিতির  আওতায় ১১০ টি মার্কেট রয়েছে৷ এরমধ্যে ৫০ থেকে ৬০ টি মার্কেটের নীচতলা ডুবে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিনে ঘুরে ও খবর নিয়ে জানা যায়, গোলাম রসুল মার্কেট, আর এস রোডের দুই পাশের দোকান, বাহার লেইন, জেবুন্নেসা রোড, মশারী গলি, মহিউদ্দিন মার্কেট, নুপুর মার্কেট,  হকার মার্কেট, রহমান ম্যানশন, রিজওয়ান কমপ্লেক্স, মোহাম্মদীয়া প্লাজা, নুপুর মার্কেটসহ অধিকাংশ মার্কেটেই পানি উঠে যায়। ভোর থেকে জমে থাকা পানি কয়েক ঘণ্টা পর সরতে থাকে। ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এই জলাবদ্ধতার জন্য তারা প্রধান সড়কের পাশের নালা নিয়মিত পরিষ্কার না করাকে দায়ী করেন।
রেয়াজ উদ্দীন বাজারের মোতালেব ফ্যাশনের ম্যানেজার মোজাফফর আহমেদ বলেন, ভারী বর্ষণ অনেক দেখেছি। এই বাজারে সর্বোচ্চ হাঁটু পানি উঠত। এবার তো সব রেকর্ড ছাড়িয়ে কোমর সমান পানি উঠে গেছে। আমাদের পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। 

সাফা মারওয়া শাড়ীজের ম্যানেজার মো. সেলিম বলেন, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে এসে দেখি এক বুক পানি। কোন মতে কিছু শাড়ী নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে পেরেছি। সাত লাখের মতো ক্ষতি হয়েছে। 

রেয়াজ উদ্দীন বাজার বণিক কল্যান সমিতির নির্বাচন তফসিল ঘোষণা হওয়ায় বর্তমানে নির্বাচিত কমিটি নেই। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি বর্তমানে সবকিছু দেখভাল করে । কমিটির আহ্বায়ক আবু তাহের বলেন, রেয়াজ উদ্দীন বাজারের ৯৫ শতাংশ দোকানের ক্ষতি হয়েছে। আমি ১৯৭৮ সাল থেকে এই বাজারে আছি। ৩৫ বছরে এত পানি এর আগে কখনও দেখি নাই। ১৯৯১ সালে একবার পানি উঠেছিল। তবে এবারের মতো না। 

তিনি বলেন, একদিনের জলাবদ্ধতায় আমাদের আনুমানিক শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাপড়ের গলিতে ২০ কোটি, ভোগ্য পণ্যের গলিতে ৪০ কোটি ও বাকি ৪০ কোটি সব মিলিয়ে হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। খাদ্য দ্রব্যের দোকানদাররা পথে বসার মতো হয়ে গেছে। 

অন্যদিকে তামাকুমন্ডি লেইন বণিক কল্যান সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, আমাদের সমিতির আওতাভুক্ত ১১০ টি মার্কেটের ৫০ থেকে ৬০ টি মার্কেটের নীচতলা ও আন্ডারগ্রাউন্ডে পানি জমে গেছে। আমরা অতীত ইতিহাসে এমন পানি দেখিনি। 

এক মাস আগেও টানা পাঁচদিনের বৃষ্টিতে এমন পানি উঠেনি। আমাদের ৬০ কোটি টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত