লাম্পি স্কিনে খামারিরা নিঃস্ব

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৬ এএম

বাংলার গ্রামীণ জীবনে গরু পালন কেবল জীবিকা নয়, এক ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পেশা। কিন্তু সর্বনাশা ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি) ভাইরাস আজ খামারিদের সেই মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে। আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা খরচ জোগাতে এবং পশুর মৃত্যুতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন হাজারো প্রান্তিক কৃষক। অথচ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে এই ক্ষয়ক্ষতির সঠিক কোনো হিসাব নেই। জনবল সংকটের অজুহাতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ঝিমিয়ে থাকায়, প্রতিনিয়ত বাড়ছে কৃষকের কান্নার রোল।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট গরুর খামার রয়েছে ১৬ হাজার ১২১টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত গাভীর খামারের সংখ্যা ৩৬৬টি এবং অনিবন্ধিত গাভীর খামারের সংখ্যা ৮ হাজার ৬০৯টি। নিবন্ধিত গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ৩৪টি আর অনিবন্ধিত খামার রয়েছে ৭ হাজার ১৪৩টি। জেলায় মোট গরু রয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৯২টি। গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৫০০ ডোজ এলএসডি টিকা সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ জেলায় টিকার চাহিদা রয়েছে প্রায় দেড় লাখ ডোজ। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালের দিকে বাংলাদেশে এই রোগ প্রথম দেখা যায়। শুরুর দিকে বড় খামারগুলোতে আক্রান্তের হার বেশি ছিল। প্রতিষেধক ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রান্তের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রান্ত্রিক পর্যায়ে কৃষি পরিবার ও কৃষি পরিবার ছাড়াও অনেক বাড়িতে গরু পালন করা হয়। তবে তারা খামারিদের মতো এত সচেতন নয়। সরকারিভাবে এই রোগের টিকা রয়েছে তা এক অ্যাম্পুলে ৫টি গরুকে দেওয়া যায়। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির যে টিকা রয়েছে তাতে এক অ্যাম্পুলে ১০ গরুকে দিতে হয়। কোম্পানির এক অ্যাম্পুলের দাম দুই থেকে আড়াই  হাজার টাকা। এ কারণে অনেক গরু পালনকারীই এই টিকা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড়লক্ষ্মীপুর গ্রামের বিধবা নারী শাহিনা বেগম। স্বামীর মৃত্যুর পর গরু পালন করেই জীবিকা নির্বাহ করছিলেন তিনি। ছোট-বড় মিলে তিনটি গরু ছিল তার গোয়ালে। তিন মাস আগে লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত হয়ে তার এক বছর বয়সী একটি গরু মারা যায়। শাহিনা বেগম বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে আমার স্বামী মারা গিয়েছেন। ছেলেদের সংসারে থাকি। নিজেরও কিছু টাকা পয়সার দরকার হয়। সে জন্য গরু পালন করি। আমার দুটি দেশি জাতের গাভী ও একটি বাছুর ছিল। তিন মাস আগে বাছুরটি লাম্পি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। ১৫দিন চিকিৎসা দেওয়ার পর বাছুরটি মারা যায়। এতে আমার প্রায় ৭০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আগে কোনো টিকা দেওয়া ছিল না। বাকি দুটিকে এখন টিকা দিয়েছি।’ পাংশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, ভাইরাস রোগ সাধারণত তার রূপ পরিবর্তন করে থাকে। লাম্পি স্কিনও এখন দুই ধরনের দেখা যায়। একটি রয়েছে গরুর শরীরে ছোট গুটি আকারে ফুটে ওঠে। এটি ফেটে বের হয় না। এটা বিপজ্জনক। আরেকটা আছে সেটি বড় আকারের গুটি হয় এবং ফেটে ঘা হয়। ফেটে ঘা হওয়াটা দ্রুত ভালো হয়। এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। গরুর খাওয়া কমে যায়। গরুর দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, লাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সারা দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণত মশা, মাছি ও আটালির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বর্ষার শুরুতে এই রোগের প্রকোপ বাড়ে। এই রোগে আক্রান্ত গরুর তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। সুস্থ গরুকে ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে এর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে খামার পরিদর্শন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারি ও প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের টিকা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। মানুষকে সচেতন করার জন্য যে পরিমাণ উঠান বৈঠক করা প্রয়োজন আমরা তা করতে পারছি না। যারা গরু পালন করে তার যদি নিয়মিত টিকা প্রদান করেন তাহলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত