ক্লাসে ৯ হাজার শিক্ষার্থীর আতঙ্ক

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

সুন্দর বনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ চরম ঝুঁকিতে। উপজেলার ১৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টির ভবনই এখন জরাজীর্ণ। ছাদের খসে পড়া পলেস্তারা, বেরিয়ে আসা রড আর পিলার-বিমের বড় ফাটল এই হলো বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান চিত্র। তীব্র শ্রেণিকক্ষ-সংকটের কারণে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায়, প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে প্রায় ৯ হাজার কোমলমতি শিশু। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কায় প্রতিনিয়ত আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষ-সংকট কিংবা অস্থায়ী শেডে পাঠদান চলছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩০। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব চৌকুনী, বাঁশখালী, মদিনাবাদ মডেল, নাকশা, ইসলামপুর, জোড়শিং, মদিনাবাদ মধ্যপাড়া, মহেশ্বরীপুর শেখপাড়া, মালিখালী, শহীদ এম গফুর, উত্তর মদিনাবাদ, চৌকুনী কালিকাপুর, বালিয়াডাঙ্গা, বেদকাশী বীণাপাণি, ২ নম্বর কয়রা, দক্ষিণ মঠবাড়ী, দক্ষিণ হড্ডা, বারোপোতা চটকাতলা, গোলখালী, দক্ষিণ ভাগবা, বগা পশ্চিমপাড়া, মঠবাড়ী শান্তিময়ী, ফরেকাটি নারানপুর, মসজিদকুঁড়, কয়রা মনোরমা, ঝিলিয়াঘাটা, বেদকাশী বড়বাড়ী, মহেশ্বরীপুর ও গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সম্প্রতি উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় অনেক ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথাও রড বেরিয়ে এসেছে, কোথাও দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি ভবনের বিম ও পিলারে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। কোথাও আবার পাকা ভবনের পরিবর্তে টিনশেডে ক্লাস চলছে। অনেক বিদ্যালয়ে নেই সীমানাপ্রাচীর, পর্যাপ্ত বেঞ্চ কিংবা শিশুদের খেলার মাঠ।

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রটি এখন আর স্বাভাবিক কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। মূল ভবনটি পরিত্যক্ত ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ায়, বিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত চারটি অস্থায়ী টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান। ভাঙাচোরা আর সংকীর্ণ এই পরিবেশেই কোনোমতে চলছে শিক্ষার আলো ছড়ানোর চেষ্টা। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইমুনা খাতুন ও সরোয়ার হোসেন তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলে, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটার দিকে তাকালেই আমাদের সব সময় ভয় লাগে। আর এখন যেখানে ক্লাস করি, সেই টিনশেডগুলোর অবস্থাও করুণ। একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। আবার কড়া রোদের সময় টিনের চাল এত গরম হয়ে ওঠে যে অসহনীয় তাপে ক্লাসে বসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাধারণ দিনে তো কষ্ট হয়ই, পরীক্ষার সময় আমাদের দুর্ভোগের আর কোনো সীমা থাকে না। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, এই চরম সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানান, উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশের অভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। এর একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উপস্থিতির ওপর। ভবনের এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে অনেক অভিভাবকই এখন তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ফলে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। পাশাপাশি, প্রাতিষ্ঠানিক অন্যান্য কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং মূল্যবান শিক্ষাসামগ্রী নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা এখন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিকল্প কোনো স্থায়ী ভবন বা জায়গা না থাকায়, মনের ভেতর প্রতিনিয়ত এক অজানা আতঙ্ক আর ঝুঁকি নিয়েই আমাদের বাধ্য হয়ে এই প্রতিকূল পরিবেশে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিয়ার রহমান বলেন, বিদ্যালয়টি কয়েকবার উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ ৫০৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন ১০ থেকে ১২টি শ্রেণিকক্ষ, সেখানে রয়েছে কয়েকটি টিনশেডের কক্ষ।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন জানান, স্থানীয়দের সহযোগিতায় এবং উপজেলা পরিষদের সহায়তায় একটি টিনশেড নির্মাণ করে কোনোভাবে পাঠদান চলছে। তিনি বলেন, ‘গরমে টিনশেডে থাকা যায় না, আবার বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীরা ভিজে যায়। দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নতুন ভবনের জন্য আবেদন করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।’ উপজেলার ফতেকাটি কুশোডাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুর রব বলেন, বিদ্যালয়টির ভবন এখন অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বর্ষা মৌসুমে গোলপাতার ছাউনি চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং অনেকেই স্কুলে আসতে চায় না। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত একটি পাকা ভবন নির্মাণের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, উপজেলার জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত বিদ্যালয় ভবনের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে যেসব বিদ্যালয়ে প্রয়োজন, সেখানে অস্থায়ী শেড নির্মাণ করে পাঠদান চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপজেলার জরাজীর্ণ, টিনশেড ও ব্যবহার অনুপযোগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভবনের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ শুরু করা হবে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত