নবীজির আগমনে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। তার জীবন ছিল মহিমা, সৌন্দর্য, আল্লাহভীতি, গাম্ভীর্য এবং প্রকাশ্য প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। তার কথা ও কাজ ছিল প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের দুঃখ কষ্ট তার কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের জন্য কল্যাণকামী। মুমিনদের প্রতি তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা তওবা ১২৮)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র পৃথিবীকে ন্যায়, নিরাপত্তা ও শান্তিতে পরিপূর্ণ করেছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তিনি সত্য, ন্যায়, সহনশীলতা, কোমলতা ও দয়ার ভিত্তি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া ১০৭)
হে ইমানদার ভাইয়েরা! সুগন্ধিময় নবীজীবনী হলো ইতিহাসের অমূল্য ভাণ্ডার, সভ্যতার সমৃদ্ধ উৎস, জ্ঞানের সুস্পষ্ট পাঠ্যক্রম এবং বাস্তব জীবনে উন্নতির কার্যকর সোপান। এর মাধ্যমে উম্মত মর্যাদা, সম্মান, সফলতা ও সঠিক পথ লাভ করে।
এটি এমন এক জীবনচরিত, যা মানবতাকে পথভ্রষ্টতা থেকে হেদায়াতের দিকে নিয়ে যায়, অজ্ঞতা দূর করে এবং তাদের মর্যাদা ও মহত্ত্বের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায়। নবীজি (সা.) আমাদের আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য নিরাপত্তার আশ্রয়। সবদিক দিক থেকেই তিনি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সত্যনিষ্ঠ আনুগত্যের সর্বাধিক হকদার।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা এবং সব মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি)
অপর হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমার নিয়ে আসা বিধানের অনুসারী হয়।’ (কিতাবুস সুন্নাহ, ইবনে আবি আসিম)
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব ২১)
এটাই সেই ভালোবাসা, যা মানুষকে আনুগত্য, অনুসরণ ও আত্মসমর্পণের মূল ভিত্তির দিকে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহর বাণী এরই প্রমাণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক বিরোধের বিচারকার্যে আপনাকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করে। অতঃপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজেদের অন্তরে কোনো সংকীর্ণতা অনুভব না করে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে তা মেনে নেয়।’ (সুরা নিসা ৬৫)
নবীজীবনী ও সুন্নাহর অনুসারীর ওপর সর্বোত্তম রহমত, শান্তি ও অভিবাদন বর্ষিত হোক। এগুলোই মর্যাদা ও বিজয়ের ভিত্তি। এগুলোই এমন উজ্জ্বল পথ, যা উম্মতের উন্নতি, মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠার ভিত্তি সুদৃঢ় করে।
তাই নবীজীবনীকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলা, এর শিক্ষা ও উদ্দেশ্যগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং দিন যতই অতিবাহিত হোক, এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা অপরিহার্য। আমাদের উচিত, এর অনুসরণ করা, বোঝা, জীবনে বাস্তবায়ন করা, চিন্তায় ধারণ করা এবং এর শিক্ষা থেকে উপদেশ গ্রহণ করা।
তিনি এমন এক নবী, যিনি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দিয়েছেন। পূর্ববর্তী নবীরা যে মহৎ গুণাবলি নিয়ে এসেছিলেন, তিনি সেগুলোর পূর্ণতা সাধন করেছেন এবং তাদের নিয়ে আসা গুণাবলির ওপর কর্র্তৃত্বশীল আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সবার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নবীজির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করা অপরিহার্য। কারণ এগুলোই পথ দেখানোর আলো এবং বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি তার আনুগত্য করো, তবে তোমরা সঠিক পথ পাবে।’ (সুরা নুর ৫৪)
আপনারা নিজেদের সন্তান ও পরিবারকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসায় গড়ে তুলুন, যা তাদের হেদায়াতের পথে পরিচালিত করবে, আনুগত্য শেখাবে এবং তার আদর্শকে জীবনে ধারণ করতে সাহায্য করবে।
হে মুসলিম উম্মাহ! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও কনটেন্ট নির্মাতাদের উচিত নবীজির সুন্নাহ, এর সঠিক উপলব্ধি, উদ্দেশ্য, শিক্ষামূলক মূল্যবোধ এবং আকিদাগত পদ্ধতি প্রচারে বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া।
সিরাতের ঘটনাবলি থেকে তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা, ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা সুদৃঢ় করা এবং এর শিক্ষা থেকে উপকৃত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সিরাত থেকে বিধান ও দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী নেক লোকদের পদ্ধতিকে তুলে ধরতে হবে এবং সমকালীন পরিস্থিতিতে সিরাতের শিক্ষাগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সাবধান! ধর্মের মধ্যে বেদয়াত, বাড়াবাড়ি এবং অবহেলা থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। এভাবেই নবীজীবনীর ঘটনা ও ঘটনাপ্রবাহকে বোঝা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হবে।
সুন্নাহ ও সিরাতকে আপনাদের জীবনের তৃষ্ণা নিবারণকারী নির্মল উৎস করে নিন। প্রত্যেক তৃষ্ণার্ত যেন সেখান থেকে পান করতে পারে। প্রত্যেক হেদায়াতপ্রাপ্ত ও পথপ্রদর্শনকারী যেন সেখানে ফিরে আসে। যাতে আমরা পথভ্রষ্ট না হই, দুর্ভাগ্যের শিকার না হই এবং মর্যাদার পথে সুখে ও সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারি।
ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান ৩১)
হে মুসলিম উম্মাহ! আপনারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ গ্রহণ করুন। তাহলে আপনাদের জন্য কল্যাণ, সংশোধন, মুক্তি, সফলতা, বিজয় ও প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হবে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি উম্মতের ভালোবাসা এবং তার সুগন্ধিময় জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল নির্দিষ্ট সময়, বিশেষ উপলক্ষ, বাহ্যিক আয়োজন কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি, প্রতিটি বিষয় এবং প্রতিটি অবস্থার সঙ্গে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
এই সম্পর্কের পূর্ণতা ঘটে নবীজির আদর্শ গ্রহণ, অনুসরণ, আনুগত্য, অনুকরণ এবং বেদয়াত থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে। একই সঙ্গে প্রবৃত্তির অনুসারী ও পথভ্রষ্টদের বিরোধিতা করাও এর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুনভাবে প্রবর্তন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি)
দ্বীনের মধ্যে যেসব ভুল, বেদয়াত ও নবপ্রবর্তিত বিষয় সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর কোনো প্রতিকার নেই দ্বীনের বিধান সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ছাড়া, যা অজ্ঞতা ও নবপ্রবর্তিত বিষয়ের অন্ধকার দূর করে দেয়।
তাই জ্ঞান অর্জনের প্রতি, বিশেষভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত শরয়ি জ্ঞান অর্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জ্ঞান অর্জন ও তা প্রদানের ক্ষেত্রে আমানতদারি ও ইখলাস বাস্তবায়ন করতে হবে। আলেম ও শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। ভালোবাসা, অনুসরণ, আদর্শ গ্রহণ ও অনুকরণের অন্যতম নিদর্শন হলো মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নিয়মিত দরুদ পাঠ করা। যে ব্যক্তি নিয়মিত তার ওপর দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তাকে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দেন।
সৃষ্টিজগতের মধ্যে সেই ব্যক্তির সৌভাগ্য কতই না বেশি, যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করে। কারণ এর মাধ্যমে তার আমলের পাল্লা ভারী হয়।
হে আল্লাহ! মুসলিম নর-নারীদের ক্ষমা করুন। তাদের হৃদয়গুলোকে পরস্পরের প্রতি ঐক্যবদ্ধ করুন। তাদের শান্তির পথ দেখান। দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের দুশ্চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্তদের বিপদ থেকে মুক্তি দিন। ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিন। অসুস্থদের সুস্থতা দান করুন।
২১ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান