রংপুরে রহস্যঘেরা চার খুন নিশ্চিহ্ন শিক্ষক পরিবার

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৫ এএম

বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে গত শনিবার রাতে তালাবদ্ধ একটি ভবন থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ভবনটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।

এই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে ঘটনাটি ঘটেছে বলে পুলিশ দাবি করলেও  অনেকে এটা মানতে নারাজ। তাদের মতে ঘটনাটি আরও বিস্তারিত তদন্তের দাবি রাখে। কথিত এই ইয়াবা সেবনকারীদের শিক্ষকের বাড়িতে প্রবেশ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে।

নিহতরা হলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১৩)। রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন।

এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যার পর খুনিরা শরীরের উত্তেজনা কমাতে শষা ও খেজুর খায়। এরপর তারা সেখানে ইয়াবা সেবন করে। গতকাল রবিবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ জানান মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। এর আগে ভোরের দিকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বাড়ি মাছুয়াপাড়ায়। তারা দুজনে সম্পর্কে মামাতো ও খালাতো ভাই। সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে কাজ করত এবং মুগ্ধ মাছের দোকানে কাজ করত।

গত তিন দিন ধরে বাড়িটি তালাবদ্ধ দেখতে পায় এলাকাবাসী। এলাকাবাসী জানায়, কয়েক দিন ধরে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না পেরে ওই শিক্ষকের আত্মীয়স্বজন এলাকায় এসে বাড়িতে তালাবদ্ধ দেখে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, সিঁড়ির কাছে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় এবং একটি কক্ষের ভেতরে খাটের নিচ থেকে তাদের ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন এবং বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ ও ছড়ানো-ছিটানো ছিল। 

পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল, এটা গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলেন। ইয়াবা সেবনের কথা প্রকাশের ভয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে গামছা পেঁছিয়ে তাকে শ^াসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার সময় গোঙানির শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদের ওপর ওঠার চেষ্টা করেন। এমন সময় তারা সিঁড়িতে প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গলায় রশি পেঁছিয়ে হত্যা করে। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী। তারা তাকেও রশি পেঁছিয়ে হত্যা করে। খুনি দুজনই একই এলাকার হওয়ায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদেরকে আগে থেকেই চেনে এবং জানে। খুনের বিষয় যাতে কেউ টের না পায় এ জন্য আয়ুসকেও রশি পেঁচিয়ে ও পরে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে।

একে একে চারজনকে হত্যার পর তারা শরীরের উত্তেজনা কমাতে গোসল করেন। এরপর তারা ডাইনিং টেবিলে বসে শসা, খেজুর খায় এবং ইয়াবা সেবন করে। হত্যার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে তারা বাড়ির আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে এবং স্বর্ণের চুড়ি খাঁটি কিনা জানতে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে। পরে বাকি রাতটুকু চেয়ারে বসে বিশ্রাম নেয় তারা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় যাতে কেউ না দেখে এ জন্য তারা অপেক্ষা করতে থাকে। এরই মধ্যে ওই বাড়িতে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডারের পানিতে ভিজিয়ে রাখে, যাতে মোবাইলে কোনো আঙুলের ছাপ না থাকে। গত শুক্রবার জুমার নামাজ শুরু হওয়ায় রাস্তা ফাঁকা দেখে তারা ওই বাড়ি থেকে সটকে পড়ে।

জানা যায়, রংপুর জিলা স্কুল থেকে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি অবসরে যান গণপতি চক্রবর্তী। তিনি নগরীর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে বসে নেশা করতে দেখে ফেলায় গণপতি স্যারসহ একে একে তার স্ত্রী-সন্তানদেরও হত্যা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। প্রিয়ম যেহেতু খুনিদের চেনে, তাই তাকেও হত্যা করে তারা। এ ঘটনায় মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারসহ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছি। আসামিদের বিচারের আওতায় আনতে দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত