সারের হাহাকার বিপর্যস্ত কৃষক

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ এএম

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার না পেয়ে কৃষকরা জোট বেঁধে একটি ডিলার পয়েন্টের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে গেছেন। গতকাল রবিবার উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের মেসার্স শাহ আমানত ডিলার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশের তৎপরতায় ৩৩ জন কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দিয়ে গেছেন। বাকিগুলো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

স্থানীয়রা বলছেন, এই ঘটনা কৃষকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ফল। কারণ তারা বারবার ডিলার পয়েন্টে গিয়েও সার কিনতে পারছিলেন না। দোকান বন্ধ করে রাখা, সার বিক্রিতে গড়িমসিসহ নানা কারণেই কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।

কৃষকদের মধ্যে এই ক্ষোভ তৈরি হওয়ার ঘটনা শুধু কুড়িগ্রামের না, উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে সারা দেশের। কারণ কৃষক সার কিনতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে। ডিলাররা পর্যাপ্ত সার বিক্রি করছেন না। যেটুকু বিক্রি হচ্ছে তার দামও চড়া। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার কিনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৬৫০ টাকা বেশি দাম দিয়ে। এতে করে কোথাও কৃষক চড়াও হচ্ছেন, ডিলারের সঙ্গে বাগবিত-া তৈরি হচ্ছে। ডিলারদের অভিযোগ সারের বরাদ্দ কম। অন্যদিকে বেশি টাকা দিলেই মিলছে সার। সারা দেশে অভিযান চালিয়েও সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কুড়িগ্রামের ঘটনাটি এরই একটি অংশমাত্র। কুড়িগ্রামের শিলখুড়ি ইউনিয়নের ডিলার শাহ আমানত ট্রেডার্সের মালিক তাইফুর রহমান মুকুল পর্যাপ্ত পরিমাণ সার বরাদ্দ পেলেও কৃষকদের দিতে গড়িমশি করেন। তার মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩২০ বস্তা সার। এর মধ্যে গুদামে মজুদ ছিল ৩৪০ বস্তা।

গতকাল সকাল থেকে তার ডিলার পয়েন্টে ২ শতাধিক কৃষক সারের জন্য জড়ো হন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ডিলার পয়েন্ট না খোলায় কৃষকরা গুদামের দরজা ভেঙে ইউরিয়া সার নিয়ে যেতে থাকেন। পরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বাকি সার রক্ষা করে।

ভূরুঙ্গামারী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, ওই ইউনিয়নে চাহিদা প্রায় ৪ হাজার বস্তা সার। কিন্তু মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩২০ বস্তা। ডিলার আবার বরাদ্দের পুরো সার উত্তোলন করেননি। এতে কৃষকের মধ্যে সার না পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয় এবং গুদাম থেকে সার নিয়ে গেছেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে থামিয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭ বস্তা সার কৃষকরা নিলেও পরে পুলিশের তৎপরতায় ৩৩ জন ৩৩ বস্তা ফেরত দিয়ে গেছেন। বাকিগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

মূলত সারা দেশে সার নিয়ে সংকটটা তীব্র হয়েছে সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ জারি করার পর থেকে। এই নীতিমালায় সারা দেশে সারের খুচরা বিক্রেতার বিধান তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে করে ৪৪ হাজারের মতো বিক্রেতা বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন। অন্যদিকে একজন ডিলারের তিনটি করে বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে যেখানে দুটিতে বিক্রয় প্রতিনিধি দেবে সংশ্লিষ্ট ডিলার। এতে একজন ডিলারের ব্যয় বেড়ে গেলেও বাড়ানো হয়নি কমিশনের পরিমাণ। আবার নতুন করে ডিলারশিপ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ায় সারা দেশে অনেকের ডিলারশিপ বাতিল হয়ে যাচ্ছে বলেও গুজব রয়েছে। এসব ডিলার আবার বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় বলে দিচ্ছেন সারের বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না, সার নেই। সব মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থিরতা। যার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ কৃষক, চড়া দাম দিয়েও সার কিনতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো উৎপাদন মৌসুমে যখন সারের চাহিদা বেশি থাকে এমন একটা সময়ে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন অস্থিরতা তৈরি করবে এটা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা একটি বড় মৌসুমে এ ধরনের ক্রাইসিস তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত করছিলেন। এই অভিযোগের তীর ছিল সাবেক কৃষি সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের দিকে। বিএনপি সরকার তাকে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠালেও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাই এখনো সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রয়েছেন। সে সময় এই নীতিমালাটিই যার হাত দিয়ে তৈরি হয়েছে তিনিই বর্তমান কৃষিমন্ত্রীর পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে গেলে সারা দেশে একটি গোষ্ঠী খেপে যাবে এটা সবাই জানে। এজন্য এর বাস্তবায়নের সময়টা বোরো মৌসুমের শেষ ভাগে (যখন সারের চাহিদা থাকে না) তখন করা দরকার ছিল। এখন মৌসুমে এই নীতিমালার বাস্তবায়ন করতে গিয়েই সরকার বেকায়দায় পড়ছে।’ 

এদিকে কুড়িগ্রামের মতো ঘটনা না ঘটলেও সার নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন কিশোরগঞ্জের কৃষক। দোকানিরা বলছেন, সার নেই, কৃষি অধিদপ্তর বলছে, পর্যাপ্ত মজুদ। এই পরিস্থিতিতে যারাই সার কিনছেন তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। প্রতি বস্তা ইউরিয়া সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। ১ হাজার ৩৫০ টাকার টিএসপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা এবং ১ হাজার ৫০ টাকা মূল্যের ডিএপি সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ টাকা বা তারও বেশি দামে।

কিশোরগঞ্জের আমন চাষের এলাকা করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর, জয়কা, জাফরাবাদ, নোয়বাদ, নিয়ামতপুর ও সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আমন রোপণে কৃষক এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ বীজতলা থেকে চারা তুলে রোপণে ব্যস্ত। এ সময় দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় সার কিনতে পারছেন না কৃষকরা। সার সংকটের কথা বলে বাড়তি দাম নিচ্ছেন ডিলাররা। ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় বিসিআইসি ও বিএডিসি তাদের সার সরবরাহ করছে না। এ পরিস্থিতিতে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে । চরম বিপাকে পড়েছেন আমনচাষিরা।

গুনধর ইউনিয়নের কদিমাইজহাটি গ্রামের কৃষক সাজু মিয়া বলেন, জমি প্রস্তুতের সময় শেষ। চাষের আগে ডিএপি বা টিএসপি সার দিতে হয়। বীজতলা তৈরির সময় ৩৫ টাকা কেজি করে ইউরিয়া সার কিনেছিলাম। কিন্তু ধান রোপণ করার জমিতে সার দেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে ঘুরছি। কোনো সারই পাচ্ছি না। যে দোকানেই যাই, বলে সার নেই।

উপজেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের স্থানীয় বাজারের বিএডিসি অনুমোদিত বীজ ডিলার মেসার্স ভূঁইয়া ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায়, ডিলার আসাদুজ্জামান রিপনের বাবা আক্কাস আলী মেম্বার। সার কোনটা কত দামে বিক্রি করছেন? জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, ডিএপি ও টিএসপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, এমওপি ২২ টাকা এবং ইউরিয়া সার ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি।

অথচ এই দোকানেই টাঙানো লাল বোর্ড মূল্য তালিকায় লেখা আছে ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা ও এমওপি ২০ টাকা। একটু পরেই দোকানে এসে বসলেন প্রোপ্রাইটর আসাদুজ্জামান রিপন। এ সময় নোয়াবাদ ইউনিয়নের ভাঙ্গাখালী গ্রামের জয়নাল মিয়া (৫২) নামে এক কৃষক তার দোকানে এলেন সার কিনতে। ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে তার দুই বস্তা সারের প্রয়োজন। সার নেই বলে কৃষককে ফিরিয়ে দেন আসাদুজ্জামান রিপন।

কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন, কয়েক বাজার ঘুরে এখানে এসেছি। কোনোখানেই সার পাচ্ছি না। এখন যে অবস্থা সার ছাড়াই চারা রোপণ করতে হবে। এতে ধানের ফলন কম হবে।

বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা মো. খোকন মিয়া বলেন, প্রতিদিনই এখন কৃষকেরা আসছেন সার নিতে। আমরা সার দিতে পারছি না। আমরা ডিলারদের কাছ থেকে সার আনি। ডিলাররা আমাদের সার দিচ্ছে না। ডিলাররা বলছে সারের নাকি সংকট।

তবে সার সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান। তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জে এ বছর ৮৫ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার রয়েছে আমাদের কাছে।

জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, জেলায় কৃষি জমির আয়তন ও চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চাহিদা যদি বাড়ে তাহলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

নাটোর, রাজশাহী, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই একই রকম চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুড়িগ্রামের ঘটনাটি আমরা খোঁজ নিয়েছি। দুদিন ধরেই একটি পক্ষ ছড়িয়েছে সারের সংকট, সার পাওয়া যাবে না। সে কারণেই এই ঘটনাটা ঘটেছে। তবে এটা এখন নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং যার যার চাহিদা অনুযায়ী সারও নিতে পারছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার রয়েছে কোনো ধরনের সংকট নেই। তারপরও একটি গোষ্ঠী ডিলারশিপসহ নানা বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে আমাদের যেহেতু সার রয়েছে, তাই এটা খুব বেশি প্রভাব ফেলছে না। কারণ যেসব ডিলার সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন তাদের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তেমনি যেসব কর্মকর্তা ঠিকমতো কাজ করছেন না তাদেরও শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।’

বাড়তি দামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম কিছুদিন দামটা বেশি নিলেও এখন এটা কমে এসেছে। এখন হয়তো কোথাও কোথাও কেজিতে এক টাকা করে বেশি চাচ্ছেন। এই এক টাকাও যাতে বেশি দিতে না হয় সেজন্য আমরা কাজ করছি। আগামী ৭-১০ দিনের মধ্যে এই চিত্রটা একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন দেশ রূপান্তরের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম পলাশ এবং কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি মো. জুয়েল রানা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত