মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন চরমে: জাতিসংঘ

উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর আরাকান আর্মির নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম ও জমি দখলের অভিযোগও তুলেছে জাতিসংঘ।

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নতুন করে তলানিতে নেমেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির ব্যাপক নিপীড়নের পাশাপাশি অবৈধ বিরল মাটি খনিজ উত্তোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংঘাতনির্ভর অর্থনীতি বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের। 

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের এক প্রতিবেদনে জুন ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত মিয়ানমারের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান সংঘাত, সামরিক সহিংসতা ও ক্রমবর্ধমান ‘সংঘাতনির্ভর অর্থনীতি’ দেশটির সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী—উভয় পক্ষই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ, জোরপূর্বক শ্রম, নির্বিচারে আটক ও বাস্তুচ্যুত করার মতো ঘটনা। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক দমন-পীড়নের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালানোর নয় বছর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর নতুন করে নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘ বলছে, দেশটির এই জনগোষ্ঠী এখনো পদ্ধতিগত বৈষম্যের মুখে রয়েছে।

এদিকে চলতি বছরের শুরুতে সামরিক বাহিনী একটি নির্বাচন আয়োজন করে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। ২০২১ সালের পর দেশটিতে অন্তত ৮ হাজার ৭৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৪ জন নারী ও ১ হাজার ৭৪ জন শিশু। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এর আগে দাবি করেছে, তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত বিমান হামলা চালিয়েছে। বিদ্রোহীদের হাতে শহর ও গ্রাম দখল এবং তাদের ভাষায় ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর’ সহিংস কর্মকাণ্ডের জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

জাতিসংঘের হিসাবে, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখে। এ ছাড়া ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে এবং প্রায় ৪ লাখ মা ও শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর আরাকান আর্মির নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম ও জমি দখলের অভিযোগও তুলেছে জাতিসংঘ। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার পথ আটকে দিয়ে তাদের জমিতে অ-রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ২ হাজার একর জমি দখল করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ছয় বছর বয়সী শিশুকেও শ্রমে বাধ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক বন্দিরা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাও জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে মিয়ানমারের কাচিন ও শান রাজ্যে অবৈধ বিরল মাটি খনিজ উত্তোলনের দ্রুত বিস্তারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে আইনের শাসন ভেঙে পড়ায় সংঘাতকে অর্থায়নকারী অবৈধ শিল্পের বিস্তার ঘটছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ২০২১ সালের পর কাচিনে নতুন করে ৩০২টি খননস্থল তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সামরিক অভ্যুত্থানের আগে শান রাজ্যে যেখানে এমন খননস্থলের সংখ্যা ছিল ১২টি, পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫টিতে।

জাতিসংঘের হিসাবে, বিরল মাটির অবৈধ বাণিজ্য থেকে ২০২৩ সালে লেনদেনের পরিমাণ সর্বোচ্চ প্রায় ১৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এর বড় একটি অংশ চীনের বাজারে গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

খনি থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য পানি ও কৃষিজমি দূষিত করছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে গর্ভপাত ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এমনকি দূষণ থাইল্যান্ডে প্রবাহিত নদীগুলোতেও পৌঁছেছে। সেখানে পরীক্ষা চালিয়ে পানিতে আর্সেনিক, সিসা, পারদ ও ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত