চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়ন্স অনুষদের নানা অসঙ্গতি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। শিক্ষকদের ক্লাসে অনুপস্থিতি, আন্তঃবিভাগীয় দ্বন্দ্ব, শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের মধ্যকার নেতিবাচক সম্পর্ক, গবেষণা বিমুখতা ও দায়িত্বহীনতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেছেন চবি উপাচার্য।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ) বেলা ১২টায় চবি মেরিন সায়েন্সস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
সরকার ঘোষিত ১৬-৩০ আগস্ট জাতীয় মৎস সপ্তাহ উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফিশারিজ বিভাগের উদ্যোগে ‘আমিষেই শক্তি, আমিষেই মুক্তি; রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে মৎস্য বিষয়ক সেমিনার ও আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনার ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।
যথাসময়ে শিক্ষকদের ক্লাসে উপস্থিত না হওয়া এবং গবেষণা বিমুখতার বিষয়টি তুলে ধরে চবি উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষক স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে ক্লাসে না যাওয়া, সঠিক সময়ে পরীক্ষা বা টিউটোরিয়াল না নেওয়া এবং গবেষণার নামে কেবল দায়সারা গবেষণা করা—এসব আমরা আর হতে দেব না। এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি ডিপার্টমেন্ট, যা শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মানিত করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে ইমপ্যাক্ট ফেলার ক্ষমতা রাখে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি আপনাদের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সমস্যা হলো আমরা সমন্বিত ও সহযোগিতামূলক কাজ করি না। অনেক প্রভাষক সঠিক সময়ে ক্লাসে আসেন না, সপ্তাহে মাত্র দুই-তিন দিন আসেন। আজ আমি ভাইস চ্যান্সেলর এবং দুজন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর দীর্ঘক্ষণ ধরে উপস্থিত থাকার পরও কিছু লেকচারার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর দেরিতে এসেছেন, যা আমি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নোট করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের দায়িত্বহীনতা আর সহ্য করা হবে না। হয় আপনাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, নয়তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আপনি থাকবেন কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। স্বাধীনতা মানে এই নয় যে আপনি নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করবেন। এমনও হয়েছে যে, একদিনে চারবার টিউটোরিয়ালের সময় পরিবর্তন করে শেষমেশ বলা হয়েছে টিউটোরিয়াল নেওয়া যাবে না। আমরা এসব বিষয় কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য, তাদের প্রয়োজনে যা যা করা দরকার আমরা তাই করব। আপনাদের মতো আমিও একজন সহকর্মী।’
শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের মধ্যকার নেতিবাচক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে চবি উপাচার্য বলেন, ‘এই ইনস্টিটিউট ও অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ভিডিও বার্তা এবং শিক্ষার্থীদের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ রয়েছে, যা আমি এই মুহূর্তে প্রকাশ করতে চাই না।’
চবি উপাচার্য বলেন, ‘দয়া করে শিক্ষার পরিবেশ আর নষ্ট করবেন না। ক্লাসে ফিরে আসুন এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করুন। কেবল নিজের ব্যক্তিগত উৎকর্ষের জন্য নয়; বরং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অ্যাকাডেমিক অবদানের লক্ষ্যে আউটপুট-ভিত্তিক গবেষণা করুন। আমরা প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য প্রস্তুত। এখন আর কেউ বলতে পারবে না যে টাকার অভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে না।’
আন্তঃবিভাগীয় দ্বন্দ্বের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ মাসে প্রশাসন কী কী কাজ করেছে, তা আপনারা দেখেছেন। আপনারা যদি প্রশাসনের কার্যক্রমে উপস্থিত না থাকেন এবং প্রশাসনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, নিজেদেরকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবেন, তবে প্রশাসন কেন আপনাদের ফাইলে কাজ করবে? আবার অনেকেই বর্তমান প্রশাসনকে পছন্দ না করে কেবল পদত্যাগের কথা বলছেন বা অজুহাত দিচ্ছেন, যা মোটেও কাম্য নয়। এগুলো মনে রাখবেন।’
শীঘ্রই মেরিন সাইন্স অনুষদের শিক্ষক সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়ে চবি উপাচার্য বলেন, ‘মেরিন সায়েন্সেসকে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গ্লোবাল ফ্যাকাল্টি বা ইনস্টিটিউট হিসেবে দেখতে চাই। অতীতে কী হয়েছে, তা নিয়ে আমরা পড়ে থাকতে চাই না। আগামী এক মাসের মধ্যে ইনশাআল্লাহ আমরা শিক্ষক সংকট সমাধান করে দেব। আমরা বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিচ্ছি। আমাকে এসব বিষয় জানানো হবে না, সেই দিন আর নেই।’
অনুষ্ঠানে চবি উপাচার্য বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানকে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’-এ রূপান্তর করতে আমাদের কাজ চলমান। ইতিমধ্যে অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এবং ইন্সটিটিউটশনাল র্যাংকিং সেল গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের জন্য নয়, গবেষণার জন্যও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত ৩০-৩৫ বছরের গবেষণার প্রভাব আমাদের অর্থনীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কতটুকু পড়েছে—তা স্বমূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অতীতে অনুকূল পরিবেশ, রিসার্চ গ্রান্ট বা ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিক কোলাবরেশনের ঘাটতি থাকলেও গত পাঁচ মাসে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবির উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে ক্তব্য রাখেন চবি মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. শাহাদাত হোসেন ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এম মাসুদুল আজাদ চৌধুরী। সেমিনারে মূখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন ফিশারিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো. রাশেদ-উন-নবী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মো. আশরাফুল আজম খান।