১৬৫ সিসির বেশি বাইক আমদানি করা যাবে না

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০ এএম

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯’ জারি করেছে সরকার। খসড়া আমদানি নীতিতে ৩৭৫ সিসির মোটরসাইকেল (বাইক) আমদানি নিয়ে আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত আমদানি নীতি আদেশে বিধানটি যুক্ত করা হয়নি। এতে আগের মতোই ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যদিও দেশে বর্তমানে ৩৫০ সিসির রয়্যাল এনফিল্ড আমদানি ও তার ব্যবহার শুরু হয়েছে। অন্যান্য ব্র্যান্ডও ১৬৫ সিসির বেশি মোটরবাইক আমদানি করে বিক্রি শুরু করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের আমদানি ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯’ জারি করা হয়েছে। গত সোমবার এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়। এতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি, ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আমদানি নীতির তৃতীয় অনুচ্ছেদের নিয়ন্ত্রিত পণ্যের তালিকার ৮ নম্বরে বলা হয়েছে, ১৬৫ সিসির ঊর্ধ্বে সব ধরনের মোটরসাইকেল আমদানি নিষিদ্ধ। তবে পুলিশ বিভাগের ক্ষেত্রে ১৬৫ সিসির এ সীমা কার্যকর হবে না। শর্ত দিয়ে বলা হয়েছে মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৫০০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারবে। তবে এ যন্ত্রাংশ কীভাবে ব্যবহার হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা আমদানি নীতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।

নতুন নীতি আদেশে বলা হয়েছে, ঋণপত্র না খুলে ক্রয় বা বিক্রয় চুক্তিপত্রের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করা যাবে। শিল্প খাতে ও বাণিজ্যিক আমদানিযোগ্য সব উপকরণ ও পণ্য ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মূল্য এবং পরিমাণ অনুযায়ী পণ্য আমদানি করা যাবে। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ ও মূল্যের বিধান রাখা হয়েছে। এর জন্য আমদানিকারককে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকে নিবন্ধিত হতে হবে।

নতুন নীতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি কার্যক্রম পরিচালনায় অধিকতর স্পষ্টতা ও কাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, আমদানি শর্ত, প্রয়োজনীয় সনদপত্র, উৎস দেশ নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা অনুসরণের বিষয়গুলোকে আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে। নীতিতে আমদানি পণ্যের উৎপত্তি দেশসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পণ্যের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির আওতায় সুবিধা গ্রহণ সহজ হবে।

এদিকে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর মূল্য সংযোজনের শর্ত খানিকটা কঠোর করা হয়েছে। বর্তমানে কাঁচামাল আমদানি করে শিশুদের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। একইভাবে কটন ও ম্যান-মেইড ফাইবার দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিতে অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্য, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ এবং ফার্নিচার রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম ভ্যালু এডিশনের শর্তারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্তর্বাস ও অন্যান্য সিনথেটিক ফাইবারের বিশেষায়িত পোশাক রপ্তানিতে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতা রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ, জাহাজ রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ এবং কাঠের তৈরি ফার্নিচার রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এই নীতিতে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), সিইপিএ, ইপিএ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে এ নীতিমালায়। এতে আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য বাধা এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএটিআই) এর মানদ- অনুসরণের বিষয়টি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।

আমদানি ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিয়ম-কানুনের জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। নতুন নীতিতে আমদানি কার্যক্রমের বিভিন্ন সংজ্ঞা, প্রক্রিয়া ও শর্তাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি নীতি শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি সহজ করবে। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্প সম্প্রসারণে সহায়তা পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া নতুন নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো আমদানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। পণ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, সনদ ও আন্তর্জাতিক মানদ-ের বিষয়গুলোকে সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন আমদানি নীতি শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামো নয়; বরং এটি দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা গ্রহণ, মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত