২০ দিন রিমান্ডেও ডেভিড ইমনের অস্ত্রভান্ডারের হদিস মেলেনি

চার মামলায় ২০ দিন জিজ্ঞাসাবাদের পরও ডেভিড ইমনের অস্ত্রভান্ডার সম্পর্কে পুলিশ কী তথ্য পেয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি।

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫১ এএম

চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কাছ থেকে ২০ দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেও তাঁর অস্ত্রভান্ডারের তথ্য জানতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, জিজ্ঞাসাবাদে ইমন ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ দিয়েছেন। সেই তথ্য কী, সে বিষয়ে কোনো কর্মকর্তা বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।

গত ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে ফটিকছড়ি থানার দুটি অস্ত্র ও একটি হত্যা মামলায় ১৫ দিন এবং হাটহাজারী থানার একটি চাঁদাবাজির মামলায় পাঁচ দিন, মোট ২০ দিন তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সবশেষ ফটিকছড়ি থানার একটি অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ইমনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। একই মামলায় তাঁর সহযোগী মো. ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াস, শামীমসহ আরও চারজনেরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত।

এদিন নগর পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চান্দগাঁও থানার শমসের পাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে আফতাব উদ্দিন তাহসিন নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার মামলায় ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সাত্তারের আদালত এ আদেশ দেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা দুজনের একজন ডেভিড ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন। রায়হানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতেন বলে তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ ছিলেন। গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, চট্টগ্রামকে অশান্ত করে রাখার পেছনে ডেভিড ইমনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় চার মামলায় ২০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার পরও তাঁর অস্ত্রভান্ডারের তথ্য কেন পাওয়া গেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে গত ১২ আগস্ট হাটহাজারী থানার চাঁদাবাজির মামলায় ইমনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের এক দিন পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সন্দ্বীপ থানায় বদলি করা হয়। রিমান্ড মঞ্জুরের পরদিন তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলি এবং ২০ দিন জিজ্ঞাসাবাদের পরও অস্ত্রভান্ডারের হদিস না মেলায় বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের কাছে রহস্যজনক মনে হচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে পুলিশি পাহারার মধ্যেই চট্টগ্রাম নগরের শীর্ষ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে সাবমেশিনগান, চায়নিজ রাইফেল, শর্টগান ও পিস্তল দিয়ে এক ডজনের বেশি গুলি ছোড়া হয়। চাঁদা না পেয়ে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ডেভিড ইমনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী থানায় দায়ের হওয়া হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির চার মামলায় ২০ দিনের রিমান্ডে ডেভিড ইমনের অস্ত্রভান্ডার সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া গেছে, জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রিমান্ডে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ইমনের কাছ থেকে অস্ত্রভান্ডার সম্পর্কে তথ্য আদায় করতে না পারলেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ভবনমালিকের কাছ থেকে তাঁর প্রতি মাসে গড়ে ১ কোটি টাকা চাঁদা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কার কার কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও ইমন তথ্য দিয়েছেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পুলিশের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, চাঁদার অর্ধেক অর্থ বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর কাছে পাঠানো হতো। বাকি অর্থ ডেভিড ইমন নিজে রাখতেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন ইমন। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন ইমন।

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আলোচিত হন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মামলা রয়েছে।

ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানে প্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ভাষ্য, গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যার মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযানের ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩০ জুলাই ভোরে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত