সংবাদ প্রকাশের পর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সেই দিনমজুর কৃষক তোফাজ্জল হোসেনকে দুই লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছেন সৌদি আরবপ্রবাসী আলহাজ্ব মিজানুর রহমান সুমন।
ইঁদুর ও উইপোকার আক্রমণে কৃষক তোফাজ্জলের জমানো প্রায় দুই লাখ টাকা নষ্ট হওয়ার ঘটনা নিয়ে গত ৯ আগস্ট দেশ রূপান্তর অনলাইনে ‘কৃষকের প্রায় দুই লাখ টাকা নষ্ট করল ইঁদুর আর উইপোকা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। দেশ রূপান্তরের ডিজিটাল মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদটি প্রকাশের পর বিষয়টি সৌদি আরবপ্রবাসী ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মিজানুর রহমান সুমনের নজরে আসে। পরে তিনি তাঁর ছোট ভাই হাবিবুর রহমান জনিকে দুই লাখ টাকা নিয়ে ওই কৃষকের বাড়িতে পাঠান।
বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে দিনমজুর কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তার হাতে দুই লাখ টাকা তুলে দেন হাবিবুর রহমান জনি। এর আগে তিনি ঢাকা থেকে গাড়িযোগে গাইবান্ধায় যান। পরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের উত্তর ধুমাইটারি গ্রামে কৃষকের বাড়িতে পৌঁছান।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর ধুমাইটারি গ্রাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুটিমারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শাহজাহান মিয়া, ব্যবসায়ী জুয়েল রানা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জামাতা ছামছুল হকসহ স্থানীয়রা।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের উত্তর ধুমাইটারি গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের (৭০) দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত প্রায় দুই লাখ টাকা ইঁদুর ও উইপোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায়। স্ত্রী-সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বছরের পর বছর ধরে তিনি টাকা জমিয়েছিলেন।
দিনমজুর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কখনো রিকশা চালিয়ে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে টাকা সঞ্চয় করেছিলেন তোফাজ্জল। তাঁর কাছে সেই টাকা শুধু কাগজের নোট ছিল না; ছিল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, পরিবারের স্বপ্ন এবং দুঃসময়ে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।
গত ৯ আগস্ট কাঠের আলমারিতে রাখা টাকা বের করে তিনি দেখতে পান, ইঁদুর ও উইপোকা নোটগুলো কেটে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। ফলে সেগুলো বাজারে চালানোর অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জমানো টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। ওই টাকার মধ্যে জমি বন্ধকের টাকাও ছিল বলে জানান তোফাজ্জল।
দীর্ঘদিনের শ্রম ও সঞ্চয় একসঙ্গে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তোফাজ্জল ও তাঁর পরিবার চরম সংকটে পড়ে। এ ঘটনায় দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
দুই লাখ টাকা সহায়তা পেয়ে খুশিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন কৃষক তোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার কষ্টের টাকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গেছে। এখন একজন মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমার খুব উপকার হলো। হারানো দুই লাখ টাকা পেলাম। তার এই সহযোগিতা আমি কোনোদিন ভুলব না। নামাজ পড়ে মিজানুর রহমান সুমনের জন্য দোয়া করব।’
এ সময় তোফাজ্জল হোসেনের পাশে বসে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৬৮)। তিনি বলেন, ‘স্বপ্নেও ভাবি নাই, হামরা হারি যাওয়া ট্যাকা ফেরত পাবমো। আজ সারা বছরের জমানো টাকা ইঁদুর আর উইপোকা খেয়েছিল। হামরা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। কুমিল্লার এক সৌদি প্রবাসী সেই ট্যাকা দিলো হামারোক। হামরা অনেক খুশি।’
পুটিমারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘ইঁদুর ও উইপোকার কারণে একজন অসহায় কৃষকের জীবনের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলেও একজন প্রবাসীর মানবিক উদ্যোগ তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো এভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে বিপদগ্রস্ত পরিবারগুলো নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।’
আলহাজ্ব মিজানুর রহমান সুমনের ছোট ভাই হাবিবুর রহমান জনি বলেন, ‘ইঁদুর ও উইপোকা গাইবান্ধার এক কৃষকের টাকা কেটে নষ্ট করেছে। আমার বড় ভাই সৌদি আরব থেকে গণমাধ্যমে বিষয়টি দেখতে পান। পরে তিনি ওই দিনমজুর কৃষককে দুই লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই টাকা দিতে আমি ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় আসি। আজ আমরা কৃষকের হাতে সহায়তা তুলে দিলাম।’