চরম অর্থ সংকটে বিওএ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৫ এএম

প্রায় এক মাসের স্টেশনারি কেনাকাটার একটি ফর্দ নিয়ে এলেন অফিস সহকারী। সেদিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুললেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) জেনারেল ম্যানেজার সাঈদ আহমেদ শাহেদ। পরে অফিস সহকারীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এক মাসের নয়, আগামীকাল কী লাগবে সেটাই কিনে আনো।’ তার কথাতেই বোঝা গেলে কতটা আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন দেশের ক্রীড়াঙ্গন-সংশ্লিষ্ট এই সংস্থাটি। দুই গেমসে প্রায় ৬ কোটি টাকা নিজেদের তহবিল থেকে খরচ করেছে। দোরগোড়ায় এশিয়ান গেমস। কিন্তু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দেওয়া সেই গেমসের বাজেট থেকেও পাওয়া যায়নি একটি পয়সাও।

এশিয়ান গেমসের আর মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন বাকি। জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠেয় এবারের আসরে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ সদস্যের বহর প্রস্তুত হচ্ছে। কিন্তু গেমসের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির সময়ই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)। একের পর এক আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণের খরচ নিজেদের তহবিল থেকে বহন করলেও এখনো সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ পায়নি দেশের অলিম্পিক ক্রীড়ার সর্বোচ্চ সংস্থাটি। আর সরকারের কাছ থেকে অর্থ না পাওয়ায় ফেডারেশনগুলোকেও দিতে পারছে না বিওএ।

বিওএ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিলে চীনের সানিয়াতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান বিচ গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এরপর জুনে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত আরেকটি আন্তর্জাতিক গেমসেও ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই আসর মিলিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা নিজেদের তহবিল থেকে খরচ করেছে বিওএ। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিপরীতে এখনো সরকারি বরাদ্দের অর্থ হাতে পায়নি সংস্থাটি।

সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ এখন এশিয়ান গেমস। জাপানের আইচি-নাগোয়ায় ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। সেখানে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ শতাধিক ক্রীড়াবিদ, কোচ, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সদস্যের যাওয়ার কথা রয়েছে। তাদের যাতায়াত, আবাসন, খাবার, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। এসব ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের কাছে প্রায় ২৪ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে বিওএ। কিন্তু এখনো সেই টাকার কোনো অংশই ছাড় হয়নি। ফলে আগের দুই গেমসে ব্যয় করা অর্থের চাপ সামলানোর পাশাপাশি এশিয়ান গেমসের বিশাল বহরের খরচ জোগাড় করা বিওএর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে যাওয়া ২২টি ফেডারেশনের প্রস্তুতিতেও একই কারণে দেখা দিয়েছে দুর্ভোগ। কারণ অনেক ফেডারেশনই তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প পরিচালনা করছে। বিওএ থেকে অর্থ না পাওয়ায় ক্রীড়াবিদদের ক্যাম্প পরিচালনা, কোচের পারিশ্রমিক, আবাসন, খাবার ও অনুশীলন-সংক্রান্ত বিভিন্ন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। কোনো কোনো ফেডারেশন নিজেদের উদ্যোগে প্রস্তুতি চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি অর্থ না পাওয়ায় তাদের ওপরও আর্থিক চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ সাইক্লিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হাসান বলেন, ‘এতদিন ধরে ক্যাম্প চালাচ্ছি, অথচ একটি পয়সাও পাইনি বিওএ থেকে। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।’ সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজলের কথা, ‘এখনো কোনো টাকা পাইনি। তাই নিজেদের ফান্ড থেকেই খরচা করছি। কবে পাব তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।’ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন বলেন, ‘অনুশীলনতো চলছেই, কিন্তু সেই খরচ মেটানোর কোনো অর্থ আমরা পাচ্ছি না। তারপরও দেখি কী হয়।’ পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেখানে ভারত এশিয়ান গেমসে থাকার জন্য ইতালির বিলাসবহুল ক্রুজ ‘কোস্টা সেরেনা’ ভাড়া করছে, সেখানে আমাদের অংশগ্রহণই এখন অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় কি আর পদকের কথা চিন্তা করা যায়?’

বিওএর জন্য পরিস্থিতি এখন দুই দিক থেকেই চাপের। একদিকে আগের দুটি আন্তর্জাতিক গেমসে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে সংগঠনটির তহবিল চাপে পড়েছে, অন্যদিকে সামনে এশিয়ান গেমসের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। হাতে সময়ও খুব কম। ফলে দ্রুত সরকারি বরাদ্দ না এলে শেষ মুহূর্তে বহরের প্রস্তুতি ও ফেডারেশনগুলোর ক্যাম্প পরিচালনায় আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে। সরকারের কাছ থেকে অর্থ ছাড় না পাওয়ায় অস্বস্তিতে রয়েছেন বিওএর মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা। তার কথা, ‘আসলেই আমরা চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছি। আগের দুই গেমসে খরচ করা ৬ কোটি টাকা পাইনি। সেটা পেলেও হয়তো এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে দিতে পারতাম। সেটা তো পাইনি, উপরন্তু এশিয়ান গেমসের জন্য দেওয়া ২৪ কোটি টাকা বাজেটের একটি পয়সাও পাইনি। কী যে হবে বুঝতে পারছি না।’ তিনি যোগ করেন, ‘যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আগেই মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব উল আলমকে বলেছিলেন অর্থ ছাড় দিতে। কিন্তু সেই অর্থ আমরা এখনো পাইনি। যার ফলে এই আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত