তামিম ইকবাল গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে নিজের প্রথম পরিচালনা পর্ষদের সভায় বড়সড় একটি সিদ্ধান্ত নেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা ক্রিকেটারদের বেতন, ম্যাচ ফি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেন। সে অনুযায়ী বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটাররা নিয়মিত নতুন কাঠামোয় বেতন পেলেও ঘরোয়া ক্রিকেট ক্যালেন্ডার শুরু না হওয়ায় অন্যান্য সুবিধা এখনো পাননি তারা। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর এবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তামিম। এ জন্য ক্রিকেটারদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কমাতে আরেক দফা পারিশ্রমিক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। পরিচালনা পর্ষদের পরবর্তী সভায় পাস করে এবার ক্রিকেটারদের প্রায় দ্বিগুণ পারিশ্রমিক হচ্ছে বলে জানান।
গতকাল ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শেষে মিরপুর স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে একটি সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ ফি ৭০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দেড় লাখ টাকা করা হয়েছে। ওয়ানডেতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং টি-টোয়েন্টিতে ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে।’ এতে একজন ক্রিকেটারের প্রতি বছরে ৩৫ লাখ টাকার ওপরে উপার্জন হবে বলেই দাবি তামিমের ‘একজন ঘরোয়া ক্রিকেটার পুরো মৌসুম খেললে, বেতনসহ বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা আয় করতে পারবেন বলে আমার হিসাব। এটা হয়তো বিলাসী জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়, কিন্তু একজন ক্রিকেটারের পরিবার চালানোর জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক আয় নিশ্চিত করবে।’ এর বাইরে ক্লাব ক্রিকেট ও আগামী বছর বিপিএল হলে আর্থিক উপার্জন আরও বাড়বে ক্রিকেটারদের।
এবার বিপিএল না হওয়ার জন্য এটা ক্রিকেটারদের আর্থিক প্রণোদনা হলেও এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে চায় না বিসিবি। অর্থাৎ এখন থেকে পরবর্তী উন্নতির আগ পর্যন্ত প্রতি বছর এভাবে পারিশ্রমিক পাবেন ক্রিকেটাররা। এ নিয়ে তামিম বলেন, ‘কোয়াবের সঙ্গে আমাদের দুটি বৈঠক হয়েছে। তারা আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। আলোচনা শেষে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এগিয়েছি। এক বছরের সমাধান আমি কখনো চাইনি। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা করতে চেয়েছি, যাতে ক্রিকেটাররা বছরের পর বছর উপকৃত হবে।’ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি কোচ-আম্পায়ারদের যেন আর্থিক ক্ষতি না হয়, সেটাও ভেবেছেন তামিম, ‘সবার বিষয়েই কাজ হচ্ছে। আম্পায়ার, কোচ, স্কোরার, ট্রেইনার, ফিজিও এমনকি কর্মীদের বেতনও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যারা ভালো কাজ করছেন, তাদের জন্য একটি উপযুক্ত ও মানসম্মত বেতন কাঠামো খুব দ্রুত তৈরি করা হবে।’
আলোচনাটা ছেলেদের ক্রিকেট নিয়ে শুরু হলেও একই দিন নারী ক্রিকেটারদেরও পারিশ্রমিক বাড়ানোর ঘোষণা দেন তামিম, ‘নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফিও শতভাগ বা তার বেশি বাড়ানো হয়েছে। আমরা শুধু পুরুষ ক্রিকেটারদের কথা ভাবছি না, নারী-পুরুষ সব ক্রিকেটারের জন্যই কাজ করছি।’
এদিকে বিপিএল খেলতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও পারিশ্রমিক বাড়ায় তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন ক্রিকেটাররা। নাম প্রকাশ করতে না চেয়ে এক ক্রিকেটার বলেন, ‘বিপিএল হলে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ে, তেমনি আমরা আর্থিকভাবেও উপকৃত হই। এবার যেহেতু বিপিএল হবেই না, আমরা চেয়েছিলাম বোর্ড যেন এটা অন্যভাবে চিন্তা করে। এ নিয়ে কোয়াবের পক্ষ থেকে আমরা কিছু প্রস্তাবনাও দিয়েছিলাম। বোর্ড যে সেটা নিয়ে ভেবেছে, এতে পুরোটা না হলেও আমাদের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করছি।’ কিন্তু আক্ষেপও করলেন কয়েকজন ক্রিকেটার। জাতীয় দলের বাইরে থাকা এমন একজন বলেন, ‘ম্যাচ খেললেই তো ম্যাচ ফি পাওয়া যাবে। কিন্তু এনসিএলে সাধারণত জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরই অগ্রাধিকার দেয় ম্যানেজমেন্ট। আমাদের মতো যারা নিয়মিত ম্যাচ পাবে না, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
যদিও এ নিয়ে এখনই কোনো ভাবনা নেই বোর্ডের। বরং ক্রিকেটারদের কাছ থেকেও শতভাগ পেশাদারত্ব প্রত্যাশা করছেন তামিম, ‘বোর্ড যখন আর্থিকভাবে সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে, তখন খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও পেশাদারত্ব প্রত্যাশা করা হবে। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে পেশাদারত্বের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ফিটনেস টেস্টে পাস না করে কোনো ধরনের অনুরোধ গ্রহণ করা হবে না। বোর্ড খেলোয়াড়দের সবকিছু দেবে, কিন্তু খেলোয়াড়দের পেশাদারত্বও খুব শক্তভাবে মনিটর করা হবে।’ পারিশ্রমিক বাড়ানোর পাশাপাশি মিরপুরের একাডেমি মাঠে একটি অ্যাথলেটিক ট্র্যাক তৈরির ঘোষণাও দেন বিসিবি সভাপতি, ‘সুবিধার দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ক্রিকেটের জন্য যতটুকু অবকাঠামো থাকা উচিত, আমরা সেই জায়গায় অনেক পিছিয়ে। একাডেমি মাঠে ১১০ মিটারের একটি অ্যাথলেটিক ট্র্যাক করার পরিকল্পনা আছে, যাতে ক্রিকেটাররা সারা বছর রানিং ও স্প্রিন্ট অনুশীলন করতে পারেন।’