আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৭ এএম

‘দেবতাদের আবাস ও উৎসবের দেশ’ নেপাল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জনপ্রিয় উক্তিটি, ব্রিটিশ পরিব্রাজক স্যার উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিকের। সেখানে ‘বাড়ির চেয়ে মন্দির, মানুষের চেয়ে দেবতা এবং বছরের দিনের সংখ্যার চেয়েও উৎসব সংখ্যা বেশি।’ ২০০৫ সালে বিমানযোগে কাঠমান্ডু পৌঁছি। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে ট্যুরিস্ট গাড়িতে চড়ে দেখি, ড্রাইভারের সামনে দুলছে গাঁদাফুলের মালা। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে মনে হলো, ভিন্ন জগতে আমরা। যে দিকে তাকাই, সেদিকে রঙিন আর উৎসব। আবাসিক এলাকায় গাড়ি প্রবেশ করতেই দেখি প্রত্যেক বাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনের দেয়ালে, ওপরে, দরজা ও জানালার সামনে অসংখ্য গাঁদা ফুলের মালা। হোটেলটি গাঁদা ফুলের মালায় সজ্জিত। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, ‘দিওয়ালী উৎসব’ চলছে। সনাতন ধর্মে, বারো মাসে তেরো পার্বণ ছাড়াও চাঁদের পূর্ণ তিথি, অর্ধতিথি ও অমাবস্যা, মহাপুরুষদের জন্ম-মৃত্যু, সব মিলিয়ে তিথি মুক্ত সাধারণ দিন খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। পাহাড় এদের দেয় পরিশ্রম আর উৎসব স্বস্তি। তাদের এক হাতে কর্ম এবং অন্য হাতে স্ফুর্তি। ধর্ম বিশ^াস থেকে সব উৎসবের উৎপত্তি। তাদের মতে, জ্ঞানার্জন, লেখাপড়া, শীত, গ্রীষ্ম, শক্তি, বৃষ্টি, মাটির উর্বরতা, রোগবালাই ও বিপদাপদ সবকিছুর জন্য পৃথক পৃথক দেবদেবী রয়েছে। তারা তুষ্ট হলে, মানুষের কল্যাণ আসে আর বিরূপ হলে বিপত্তি। তাই ভিন্ন দেবদেবীকে, ভিন্ন উপায়ে খুশি করার জন্য একটার পর একটা উৎসব থাকে। বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায় উৎসবগুলোর কোনটা ধর্মীয় আর কোনটা সংস্কৃতিনির্ভর পার্থক্য করা কঠিন। শুধু ফুল নয়। হলুদ ও লাল কাপড়ে ছেয়ে গেছে দেশ। রঙিন বস্ত্রবিহীন মহিলা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সর্বাঙ্গে গাঁদা ফুলের মালা পেঁচিয়ে, রঙিন বস্ত্র পরে তারা শুধু হাঁটাহাঁটি করে না নাচানাচিও করে। রঙিন বেশে দলবেঁধে ফুলের ডালা হাতে তারা বাড়ি বাড়ি যায়, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে গিয়ে ঢোল-তবলা-খঞ্জনীর তালে নাচতে থাকে। এক বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা, সবাই নাচে। যে যেভাবে পারে, সে সেভাবে নাচে। কারও কণ্ঠে গানের ছন্দ, মুখে হাসির ঝিলিক। সব মিলিয়ে অপরূপ দৃশ্য।

বাসে  চড়ে কাঠমান্ডু ভেলীর উঁচু পাহাড় ছাড়তেই, সামনে আসে একঝাঁক শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতি। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিতে বাধ্য হন। গাড়ির সামনে খেমটা নাচ। কিশোরী ও যুবতি মেয়েরা টাইটফিট মোটা জিনসের পেন্ট, ভারী সুতি গেঞ্জি পরে হাতের কনুই ওপরের দিকে বাঁকা করে নাচে। বাস থামিয়ে যখন নাচে, তখন যাত্রীরা হাততালি দিতে থাকে। ড্রাইভার সহাস্যে পকেট থেকে দশ টাকার একটা নোট, খেমটাদের একজনের হাতে দিতেই হুড়মুড় করে এক পাশে সরে যায়। শুধু গাড়ির সামনে নয়, বাড়ি-প্রতিষ্ঠানে একই চিত্র। কিছু দূর যাওয়ার পর আরেক দল, আবার থামানো হয় গাড়ি। একইভাবে নাচানাচি করে দশ টাকা গুণে ড্রাইভার মুক্তি লাভ করে। পোখারা বাজারে ফল কিনতে গিয়ে, এক দোকানের সামনে যুবক-যুবতিদের নাচতে দেখে থমকে যাই। নেপালি মেয়েদের নৃত্য মন থেকে হারিয়ে যাবে না। মধ্য সেপ্টেম্বরে পালন করা হয়, ইন্দ্রযাত্রা। দেবরাজ ইন্দ্র খুশি থাকলে, ঠিকমতো মেঘ বৃষ্টিসহ সবুজ হয়ে উঠবে ফসলের মাঠ। সপ্তাহব্যাপী চলে এ উৎসব। লন্ডন, আরব, ভারত, মালয়েশিয়াসহ যত দেশে গেছি সমস্ত দেশের মধ্যে গরিব নেপাল। তারপরও ওইসব দেশের চেয়ে বেশি সুখি মনে হয়েছিল তাদের। হিন্দুগরিষ্ঠ দেশ নেপাল। ২০০৭ সালের আগে নেপাল সাংবিধানিকভাবে বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন ধর্ম নিরপেক্ষ। দেশটির ৮২% হিন্দু। এই হাসির দেশে প্রথম কান্না শুরু হয়, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে। শুরু হয় শোকের মাতম। ভূমিকম্পের পর নেপালের যে দিক চোখ যায় সেদিকে আগুন। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় পোড়া মাংসের গন্ধ। সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে, সারি সারি চিতা। কাঠ-খড়ের আগুনে ছাই হচ্ছে প্রিয়জনের মৃতদেহ। পানি নেই, চরম খাদ্যসংকট। রাস্তায় গলা-পচা লাশ। দুর্গন্ধে বাতাস ভারী। নতুন পর্যটক যাওয়া বন্ধ। পুরনো পর্যটকরা নেপাল ছেড়ে পালাচ্ছেন। এক যুগ পার হতে না হতেই, সম্প্রতি উত্তর সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে, দেশজুড়ে গভীর শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং এখনো চার হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ। স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে, শত শত শোকসন্তপ্ত পরিবার তাদের আত্মার শান্তির জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, হিমালয় অঞ্চলে সঞ্চিত শক্তির কারণে ভবিষ্যতে ৮ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। 

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, ২০১৫ সালে ৭.৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে নেপালে যে ক্ষতি হয়েছিল, একই ভূমিকম্পে তিলোত্তমা ঢাকা হয়ে উঠতে পারে অগ্নিকুণ্ড। ঢাকা মহানগর বড় ধরনের ভূমিকম্পনের কবলে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে যত মানুষ মারা যাবে তার কয়েকগুণ মারা যাবে আগুনে পুড়ে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। কারণ ভূমিকম্পের পর গ্যাসলাইনের পাইপে বিস্ফোরণ হবে আর সেই আগুনে পুরো নগর জ্বলবে। আমরা কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছি?

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত