গোলাপি ডানার চন্দনা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৬ এএম

যানজট, জীবনজট, ধোঁয়া-ধুলো আর এক কংক্রিটের শহর ঢাকা। ইট-পাথরের এ শহরে যেখানে খাঁচায় রূপসী পাখির দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব, সেখানে ঢাকার ছোট্ট গ্রাম খ্যাত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ক্যাম্পাসে প্রতিদিন দেখা মিলে এক দৃশ্য।

ক্যাম্পাসের কৃষি অনুষদের পুরনো শহীদ মিনারের পাশে একটি কাঠবাদাম গাছে প্রতিদিন দেখা যায় বিরল প্রজাতির এক ঝাঁক চন্দনা টিয়া। এক পায়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পরম তৃপ্তিতে তারা দুপুরের খাবার খায়। পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে খাওয়ার এই বিশেষ কৌশল টিয়া প্রজাতির এক অনন্য শারীরিক বৈচিত্র্য।

প্রায় ৮৭ একর আয়তনের শেকৃবি ক্যাম্পাস ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হলেও এর সমৃদ্ধ সবুজ পরিবেশের জন্য এটি এক অনন্য বায়োলজিক্যাল হটস্পট। ক্যাম্পাসের পুরাতন আম, কড়ই, মেহগনি ও দেবদারু গাছগুলো পাখিদের জন্য আদর্শ প্রাকৃতিক বাসস্থান। আবাসন আর উন্নয়নের নামে ঢাকায় প্রাচীন গাছ কেটে ফেলায় শেকৃবির এই সবুজ পরিবেশ এখন চন্দনা টিয়াদের নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিদিন ক্যাম্পাসের এগ্রোনমি ফিল্ড, হর্টিকালচার ফার্ম, পুরনো এগ্রিবিজনেস অনুষদ, এগ্রোফরেস্ট ফিল্ডসহ বিভিন্ন স্থানে শতশত টিয়া ঝাঁকেঝাঁকে উড়ে বেড়ায়।

টিয়াদের মধ্যে আকারে সবচেয়ে বড় চন্দনা টিয়া। এর ইংরেজি নাম Alexandrine Parakeet। বৈজ্ঞানিক নাম Psittacula eupatria। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট এই পাখিটির প্রধান চেনার উপায় এর কাঁধে লাল রঙের বিশেষ ছোপ, ঘাড়ের পেছনে নরম গোলাপি-কালো রঙের রিং এবং একটি শক্ত, টকটকে লাল বাঁকা ঠোঁট। টিয়া নিজে গর্ত খুঁড়তে পারে না; পুরনো গাছে কাঠঠোকরার ছেড়ে দেওয়া কোটর বা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া গর্তেই এরা বংশবৃদ্ধি করে।

পৃথিবীতে প্রায় ৪০০ প্রজাতির টিয়াপাখি পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বাংলাদেশে ৭ প্রজাতির টিয়ার দেখা মেলে। যার মধ্যে সবুজ টিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া চন্দনা টিয়া, মদনা টিয়া, ফুলমাথা টিয়া ও বাসন্তী লটকন টিয়া অন্যতম। এরা সাধারণত সুন্দরবন, লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা এবং দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ বনাঞ্চলের পুরনো ও কোটরযুক্ত গাছে দলবদ্ধভাবে বাস করে।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আকর্ষণীয় ও পরিচিত পাখি হলো টিয়া। ছন্দময় উড্ডয়ন, উজ্জ্বল সবুজ পালক আর মানুষের কণ্ঠস্বর অনুকরণের ক্ষমতার জন্য এই পাখি যুগ যুগ ধরে বাঙালির গ্রামীণ ও নগর সংস্কৃতিতে জড়িয়ে রয়েছে। তবে বর্তমানে দ্রুত বন উজাড়, বড় বড় গাছ কর্তন, আবাসন ও খাদ্য সংকট এবং অবৈধ শিকারের কারণে টিয়ারা চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত