২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে নিরাপদ পানি অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা করে আসছে ড্রিংকওয়েল (ডব্লিউআইএসটি বাংলাদেশ লিমিটেড)। ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় রাজধানীতে প্রায় ৩০০টি ওয়াটার এটিএম পরিচালনার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী ও খুলনাতেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের ব্যবসার ভিত্তি পানি অবকাঠামো রাজনীতি নয়।
ড্রিংকওয়েলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজ চৌধুরী বলেন, সাবেক সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নির্ভরশীল ছিলÑ এমন অভিযোগ বাস্তবতাবিবর্জিত। এ অভিযোগের সমর্থনে ব্যবহৃত আলোকচিত্র দুটি সরকারি নথিভুক্ত ব্যবসায়িক ও আন্তর্জাতিক পানি খাতের অনুষ্ঠানের।
তিনি দাবি করেন, একটি ছবি ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল আয়োজিত ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের অনুষ্ঠানে তোলা, যেখানে মেটা, ভিসা, উবার, মাস্টারকার্ড ও মেটলাইফসহ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। অন্যটি মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ওয়াটার সামিটের ছবি। সেখানে তৎকালীন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রীর উপস্থিতি ছিল আন্তর্জাতিক পানি খাতের একটি স্বাভাবিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ।
ড্রিংকওয়েলের বক্তব্য, কোনো বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের অনুষ্ঠানে বা আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনে সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে ছবি থাকা কোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণ হতে পারে না।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার দাবির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সরকার পরিবর্তনের পর সেই ব্যবসা টিকে থাকে কি না। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তন, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সময় এবং বর্তমান প্রশাসনের অধীনেও ড্রিংকওয়েলের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা ওয়াসা, কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ তাদের অংশীদারত্বের ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেনি বলেও দাবি করেছে ড্রিংকওয়েল।
চাকরিতে থাকা তিন কর্মকর্তার নামে প্রতিযোগী কোম্পানি : ড্রিংকওয়েলের দেওয়া সরকারি রেজিস্ট্রি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ জুলাই ‘ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্ট কনসার্ন লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি নিবন্ধিত হয় (নিবন্ধন নম্বর সি-২০৩৩৯২)। কোম্পানিটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মো. সাদ্দাম হোসেন রনি, মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ চৌধুরী ও আরিফুল হাসান রাহাত। তাদের প্রত্যেকের নামে ১ হাজার করে শেয়ার রয়েছে। অনুমোদিত মূলধন ৪০ লাখ টাকা।
ড্রিংকওয়েলের দাবি অনুযায়ী, কোম্পানিটি নিবন্ধনের সময় তিনজনই ডব্লিউআইএসটি বাংলাদেশ লিমিটেডের বেতনভুক কর্মী ছিলেন। নবী নেওয়াজ ছিলেন সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং ও এইচআর); সাদ্দাম হোসেন রনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (বিজনেস অপারেশনস ও কো-অর্ডিনেশন) এবং আরিফুল হাসান রাহাত সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (অপারেশনস ও বিলিং)।
নিয়ম মেনেই হয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা : ড্রিংকওয়েলের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই ২০২৫ নবী নেওয়াজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ২০ আগস্ট তিনি লিখিত জবাব দেন। ২২ সেপ্টেম্বর তার ব্যাখ্যা অসন্তোষজনক বিবেচিত হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কোম্পানিটির দাবি, তদন্ত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের লিখিত বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে নিজেদের বক্তব্য ও সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকি কর্মীদের নিজেদের প্রতিনিধি মনোনয়নের সুযোগও দেওয়া হয়েছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর নবী নেওয়াজ প্রতিনিধি মনোনয়নে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তার পক্ষে একজন প্রতিনিধি মনোনয়ন করে। ২৫ সেপ্টেম্বর তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে নবী নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন রনির বিরুদ্ধে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, ড্রিংকওয়েলের দাবি অনুযায়ী, কাউকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বরখাস্ত করা হয়নি; কারণ দর্শানো, লিখিত জবাব, তদন্ত কমিটি, প্রতিনিধিত্ব এবং শুনানির মধ্য দিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে নবী নেওয়াজ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাওনা অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগে কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেন। ড্রিংকওয়েল জানিয়েছে, তারা মামলাটি মোকাবিলা করছে এবং তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে : ড্রিংকওয়েলের তথ্যপত্রে তৎকালীন অ্যাকাউন্টস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধেও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোম্পানিটির দাবি, ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি নবী নেওয়াজের প্রকৃত বেতনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেতনের একটি সার্টিফিকেট দেন। ওই অতিরিক্ত আয়ের তথ্য ব্যবহার করে ডিবিএইচ ইসলামিক ফাইনান্স থেকে নবী নেওয়াজকে কোটি টাকার ঋণ পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ড্রিংকওয়েলের। এ ছাড়া মাহমুদুল হক নবী নেওয়াজের সহযোগী হিসেবে কোম্পানির বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ সংক্রান্ত নথি ও প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছে ড্রিংকওয়েল।
‘অভিযোগ নয়, নথিই হোক যাচাইয়ের ভিত্তি’ : ড্রিংকওয়েলের সিইও মিনহাজ চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান যাচাইয়ের জন্য তাদের কথার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্ট কনসার্ন লিমিটেডের আরজেএসসি ফর্ম, স্মারকলিপি ও সংঘবিধি থেকে শুরু করে কারণ দর্শানোর নোটিশ, কর্মীদের জবাব, তদন্ত কমিটির নথি, বরখাস্তের আদেশ, আদালতের নথি এবং ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি সরবরাহ করতে আমরা প্রস্তুত।
তবে ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্ট কনসার্ন লিমিটেড কোনো সরকারি চুক্তি পেয়েছে বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনুচিত আচরণ করেছেন বলে দাবি করেনি। আদালতে বিচারাধীন বিষয়গুলোর সিদ্ধান্তও আদালতেই হবে বলে মনে করছে তারা।
তাদের ভাষ্য, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কাজ করা একটি পানি অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের জন্য ইউটিলিটি সংস্থা, মন্ত্রণালয় বা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ব্যবসার অংশ। সেটিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান, সরকারি রেকর্ড, চুক্তি এবং কোম্পানি রেজিস্ট্রির নথি যাচাই করাই যথাযথ। তারা যাচাই-বাছাইকে স্বাগত জানায় এবং সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য দিয়ে যেকোনো অনুসন্ধানে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।