তিন বছর পর আলোর মুখ দেখছে ডিজিটাল ব্যাংক

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

দেশে ডিজিটাল ব্যাংকব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের পর পেরিয়ে গেছে তিন বছরের বেশি সময়। নীতিমালা প্রণয়ন, আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই, দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক অনুমোদন, নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের তফসিলি ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্তি, পরে সেই লাইসেন্স নিয়ে পুনর্বিবেচনা সব মিলিয়ে নানা ধাপ পেরিয়ে এবার আবারও ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক সম্মতিপত্র বা লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

তবে এলওআই পাওয়াকে চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এলওআইয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ব্যাংক চালুর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মূলধনসহ অন্যান্য শর্ত পূরণের পরই চূড়ান্তভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

দেশে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নীতিমালা অনুমোদন করে। পরদিন ১৫ জুন ‘ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নির্দেশিকা’ জারি করা হয়। তখন ডিজিটাল ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার আওতা বাড়ানো। প্রচলিত ব্যাংকের মতো শাখা-উপশাখা নির্ভর না হয়ে ডিজিটাল ব্যাংক মূলত মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেবা দেবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত ও কম সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

নীতিমালা জারির পর ২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন আহ্বান করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন ৫২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। কয়েক ধাপে যাচাই-বাছাইয়ের পর ৯টি প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু হয় এবং ব্যাংকটির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত কার্যক্রম এগোয়নি। ফলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে কোনো ডিজিটাল ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকের জন্য পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

প্রথম দফার প্রক্রিয়া থেমে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় দফায় আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের শেষ সময় কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ২ নভেম্বর ২০২৫ করা হয়। এবার মোট ১২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করে।

আবেদনকারীদের মধ্যে ছিল বিকাশ, রবি-সমর্থিত বুস্ট, বাংলালিংকের উদ্যোগে নোভা, ভুটানের ডিকে ব্যাংক-সমর্থিত ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, আমার ডিজিটাল ব্যাংক, ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক, অ্যাপ ব্যাংক, মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক ও মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

দ্বিতীয় দফার আবেদনের আগে ডিজিটাল ব্যাংকের মূলধন সংক্রান্ত শর্তেও বড় পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৩ সালে যেখানে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ছিল ১২৫ কোটি টাকা, পরে তা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়। বর্তমান নির্দেশিকায় একটি ডিজিটাল ব্যাংককে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে। ডিজিটাল ব্যাংক হবে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর অধীনে লাইসেন্স নিতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংককে প্রচলিত ব্যাংকের মতো করপোরেট সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মানদ- অনুসরণ করতে হবে।

ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর শাখাহীন কার্যক্রম। এসব ব্যাংকের প্রচলিত শাখা, উপশাখা, এটিএম, নগদ জমা মেশিন বা নগদ উত্তোলন কাউন্টার থাকবে না। গ্রাহক মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা নেবেন।

গ্রাহক হিসাব খোলা, টাকা জমা, অর্থ স্থানান্তর, পরিশোধ, ঋণসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা ডিজিটাল মাধ্যমে নিতে পারবেন। ভার্চুয়াল কার্ড ও কিউআর কোডভিত্তিক পরিশোধব্যবস্থাও চালুর সুযোগ থাকবে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব শাখা থাকবে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত