মানবদেহ আল্লাহর বিস্ময়কর নিদর্শন

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব। মহান আল্লাহ তাকে দিয়েছেন বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা। মানবদেহের দিকে গভীরভাবে তাকালে প্রতীয়মান হয়, এর প্রতিটি অঙ্গ, কোষ ও প্রতিটি জৈবিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে সুনিপুণ পরিকল্পনা ও অসাধারণ সমন্বয়। পবিত্র কোরআন মানুষকে নিজের দিকে দৃষ্টি দিতে আহ্বান করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে), তোমরা কি তা দেখো না?’ (সুরা জারিয়াত ২১)

এই আয়াত মানুষের নিজের অস্তিত্ব ও দেহের প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানায়। মানুষ আকাশ-জমিনের বিশালতা নিয়ে চিন্তা করে, অথচ তার নিজের শরীরের ভেতরেই যে এক বিস্ময়কর জগৎ বিদ্যমান, তা অনুধাবন করতে পারে না।

ক্ষুদ্র কোষে বিশাল জগৎ : মানবদেহ কোটি কোটি কোষের সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি কোষের রয়েছে নিজস্ব কাঠামো ও কার্যপ্রণালি। কোষের ভেতরে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয়, প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি হয় এবং বর্জ্য অপসারণ করা হয়। একটি ক্ষুদ্র কোষের ভেতরের সুশৃঙ্খল কার্যক্রমও মানুষকে সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

হৃদযন্ত্র : হৃদযন্ত্র হলো নিরবচ্ছিন্ন কর্মযন্ত্র। হৃদযন্ত্র প্রতিনিয়ত রক্ত সঞ্চালন করে চলেছে। আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও এটি কাজ বন্ধ করে না। রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছে যায় এবং বিভিন্ন বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণের প্রক্রিয়ায় শরীরকে সহায়তা করে।

হৃদযন্ত্রের এই নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞের জন্য মানুষকে আলাদা করে কোনো নির্দেশ দিতে হয় না। আমরা চাই বা না চাই, এটি নিজের নিয়মে কাজ করে যায়। এ কারণে সুস্থতার সময় মানুষ বুঝতেই পারে না, তার শরীরের ভেতরে কত বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রতিনিয়ত চলছে।

মস্তিষ্ক : মস্তিষ্ক হলো চিন্তা ও উপলব্ধির কেন্দ্র। এটি মানুষের অন্যতম জটিল অঙ্গ। চিন্তা, স্মৃতি, ভাষা, অনুভূতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমন্বয়সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে মস্তিষ্ক জড়িত।

মহান আল্লাহ মানুষকে শ্রবণ, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় তথা উপলব্ধির ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদের জন্য শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা নাহল ৭৮)

চোখ : চোখের মাধ্যমে আমরা আলো, রং, আকার ও গতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করি। চোখের বিভিন্ন অংশ সমন্বিতভাবে কাজ করে বাহ্যিক দৃশ্যকে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। সামান্য একটি অঙ্গের এই জটিল কার্যপ্রণালি মানুষকে বিস্মিত করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তার জন্য দুটি চোখ বানাইনি?’ (সুরা বালাদ ৮)

মানুষ যদি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে নিজের স্বাভাবিক জীবনের কথা চিন্তা করে, তাহলে বুঝতে পারবে, দৃষ্টিশক্তি তার জন্য কত বড় নেয়ামত।

শ্রবণ ও বাকশক্তি : মানুষের কান শ্রবণসংক্রান্ত জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শব্দকে স্নায়বিক সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে জিহ্বা, কণ্ঠনালি ও মুখের বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বয়ে মানুষ অসংখ্য শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পরম দয়ালু (আল্লাহ)। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনি তাকে শিখেয়েছেন ভাষা।’ (সুরা আর-রহমান ১-৪)

শিশুর ভাষা শেখার সক্ষমতা, মানুষের চিন্তাকে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা এবং একজনের কথা অন্যজনের বুঝতে পারা, সবই আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত।

দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা : মানবদেহে এমন একটি জটিল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, যা ক্ষতিকর জীবাণু ও বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। শরীরের বিভিন্ন প্রতিরোধব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে আমাদের সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে।

মানুষের অজান্তেই শরীরের ভেতরে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অসুস্থ হওয়ার পর আমরা বুঝতে পারি, সুস্থতা আসলে কত বড় নেয়ামত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত। তা হলো সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি ৬৪১২) দেখা যায়, সুস্থ শরীরের মূল্য মানুষ অনেক সময় অসুস্থ হওয়ার আগে উপলব্ধি করতে পারে না।

ঘুমও আল্লাহর নিদর্শন : মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার পর মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার কর্মকাণ্ড স্থগিত থাকে। মহান আল্লাহ রাতকে মানুষের বিশ্রামের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম।’ (সুরা নাবা ৯)

আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের ঘুম অন্যতম। ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর মানুষ আবার নতুন উদ্যমে জীবনযাত্রা শুরু করে।

ভ্রুণ থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ : মানবজীবনের সূচনাও বিস্ময়কর। মাতৃগর্ভে একটি ক্ষুদ্র সূচনা থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবশিশুর জন্ম হয়। কোরআন মানবসৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাকে শুক্রবিন্দু হিসেবে এক নিরাপদ স্থানে স্থাপন করেছি। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট বাঁধা রক্তে, অতঃপর মাংসপিণ্ডকে পরিণত করি হাড্ডিতে, অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করি মাংস দিয়ে, অতঃপর তাকে এক নতুন সৃষ্টিতে উন্নীত করি। কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!’ (সুরা মুমিনুন ১২-১৪)

এই আয়াতগুলো মানুষকে তার সৃষ্টির সূচনা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।

প্রতিটি অঙ্গই আমানত : মানবদেহ মহান আল্লাহর দেওয়া আমানত। চোখ দিয়ে কী দেখছি, কান দিয়ে কী শুনছি, জিহ্বা দিয়ে কী বলছি, হাত দিয়ে কী করছি এবং পা দিয়ে কোথায় যাচ্ছি, এসব বিষয়ে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়, এসবের প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা ইসরা ৩৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে কয়েকটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। তা হলো, তার জীবন কীভাবে অতিবাহিত করেছে, তার জ্ঞান অনুযায়ী কী করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে, কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর কী কাজে ক্ষয় করেছে।’ (জামে তিরমিজি ২৪১৭)

তাই দেহের প্রতি যত্ন নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেহের অঙ্গগুলোকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহার না করাও ইমানি দায়িত্ব।

দেহ নিয়ে চিন্তা : মানুষ যখন নিজের শরীরের দিকে গভীরভাবে তাকায়, তখন সে বুঝতে পারে, তার অস্তিত্ব কতটা নির্ভরশীল। হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, চোখ, কান, রক্তসঞ্চালন, হজম, রোগ প্রতিরোধ, সবকিছু একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ না করলে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়।

এ কারণেই কোরআন মানুষকে নিজের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছে। নিজের দেহের প্রতি সচেতন পর্যবেক্ষণ মানুষকে অহংকারের পরিবর্তে কৃতজ্ঞতা শেখায়।

ক্ষুদ্র কোষ থেকে শুরু করে জটিল মস্তিষ্ক, স্পন্দিত হৃদযন্ত্র, আলো গ্রহণকারী চোখ, শব্দ গ্রহণকারী কান এবং অসংখ্য স্বয়ংক্রিয় জৈবিক প্রক্রিয়া মানুষের সামনে সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে।

মানুষ যদি নিজের শরীরের দিকে ইমানি ও চিন্তাশীল দৃষ্টিতে তাকায়, তাহলে তার অন্তরে কৃতজ্ঞতা ও স্রষ্টার মহত্ত্বের অনুভূতি আরও গভীর হবে। নিজের অস্তিত্বের দিকে তাকিয়েই মানুষ তার রবকে চিনতে পারবে।

মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ কি শুধুই শারীরিক প্রয়োজন পূরণের উপকরণ? না, বরং তা মহান আল্লাহর কুদরত, হেকমত ও অসীম সৃষ্টিশক্তির এক জীবন্ত নিদর্শন। এই নেয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন হলো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপ থেকে রক্ষা করা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকা।

লেখক : আরবি প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল, বন্দর, চট্টগ্রাম

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত